নন্দনঃ জীবন ও শিল্পঃ একটি সত্তাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

                                           স্বাস্ত্যনীক নিকষানন

          শিল্প এক রহস্যময় সম্মোহনী শর,যার লক্ষ্যভেদী নিক্ষেপে শিল্পী-শরস্বান আমাদের অনুভূতিকে শাসন করেন এবং তাঁর সেই সম্মোহনী শাসনে সংবেদক চেতনায় ঝলসে ওঠে অনুভূতির অনুপম নির্ঝর। তিনি আমাদের হাসান, কাঁদান, ভাবান। তাঁর চোখের আলোয়, তাঁর দৃষ্টির দ্রষ্টব্যে, তাঁর অনুভূতির তারের কম্পনে আমরা নেচে উঠি, বিষণ্ণ, বেদনার্ত, বিস্মিত, শিহরিত হই। আমাদের ভাল লাগে। কী এই ভাল লাগার, নান্দনিক অভিজ্ঞতার রসায়ন সূত্র? শিল্পের এই রহস্যময় সম্মোহনী শক্তির উৎস কী? কবিতা গান ছবি কেন আমাদের ভাল লাগে, সম্মোহিত করে? আবার একই কবিতা ছবি গানের সম্মোহন বিভিন্ন ব্যক্তির চেতনার উপর একই রকম নয় কেন? কেউ তাতে মগ্ন আলোড়িত, কেউ তাতে উদাসীন অসংসক্ত। শৈল্পিক সম্মোহনের লক্ষ্য ও ফলাফলই বা কী? তা কি কেবলই আনন্দ, না কি তার আছে কোনো সামাজিক উদ্দেশ্য সাধক ভূমিকা? শিল্পের উপভোগগত আনন্দানুভূতির সংগে সামাজিক মংগল লক্ষ্যে, সমাজের কাংখিত পরিবর্তন সাধনে তার ব্যবহারিক উদ্দেশ্যমূখী ভুমিকার কি কোন বিরোধ আছে ? বা আমরা শিল্পের উপভোগে আনন্দিত হই কেন? কী এই আনন্দের স্বরূপ?

          এত যে তর্ক সাহিত্য তথা শিল্প জীবনের জন্য, না, তা শুধুই বিশুদ্ধ আনন্দের, নান্দনিক উপভোগের জন্য, তার উৎসটাই হল সাহিত্যের স্রষ্টা বা উপভোক্তা যে মানুষ তার সত্তাগত, চেতনাগত বৈশিষ্ট্যের বিশ্লেষণ না করা। শিল্প সম্মোহনের লক্ষ্য চেতনায় আনন্দ-নির্ঝরের উৎসমূখ খুলে দেওয়া বা সামাজিক প্রগতি লক্ষ্যে চেতনার দিশায়ন – যাই হোক না কেন, মানুষের দেহগত আত্মচেতনিক সত্ত্বার প্রকৃতি, ক্রিয়া, ও অনুভূতিগত বিভিন্ন বৈশিষ্টের মধ্যেই প্রোথিত আছে শৈল্পিক সম্মোহনের নন্দন সঞ্চারক শক্তি, বা তার সামাজিক প্রগতিমুখীন চেতনা সৃষ্টির রহস্যময় রসায়ন।

মানুষের শৈল্পিক-নান্দনিক অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তি, প্রকৃতি, প্রভাব ও প্রয়োজন কী তার বিশ্লেষণে মূল যে বিষয়গুলোর অনুসন্ধান জরুরী তা হল -১। মানুষের সত্তাগত বিশ্লেষণ অর্থাৎ মানব সত্তার স্বরূপ, প্রকৃতি, অন্তর্গঠন ও বৈশিষ্ট্য সমূহের বিশ্লেষণ। ২। মানুষের চেতনার জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বরূপ ও প্রক্রিয়াগত বিশ্লেষণ। অর্থাৎ  জ্ঞানের চেতনাগত ভিত্তি, জ্ঞানের বিষয়, ও জ্ঞানের চেতনাগত প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ। ২। মানুষের ক্রিয়াতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। অর্থাৎ মানুষের ক্রিয়ার কারণ, প্রকৃতি, লক্ষ্য ও ফলাফলের বিশ্লেষণ। ও ৪। মানব চেতনার নান্দনিক অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ অর্থাৎ আনন্দের স্বরূপ, তার সৃজনী উৎস ও পদ্ধতির বিশ্লেষণ। এই চতুর্মুখী বিশ্লেষণের সামগ্রিক ফোকাসেই ধরা পড়বে সাহিত্য তথা শিল্পের সৃষ্টিতত্ত্ব, বিষয়তত্ত্ব, প্রকরণ তত্ত্ব, উপভোগ তত্ত্ব ও প্রভাবতত্ত্ব এক অখণ্ড ঐকিক সূত্রে।

          মানুষ একটি সত্ত্বা(being)। বিশেষণবাচক ‘সদ’ শব্দটি থেকেই বিশেষ্যবাচক সত্তা শব্দটি আহৃত। সদ মানে যা আছে, অর্থাৎ existent। যার আছে বস্তুগত অস্তিত্ব, বাস্তব প্রক্রিয়াগত অস্তিত্ব। মানুষ একটি সত্তা। কারণ মানুষের আছে বস্তুগত অস্তিত্ব। কিন্তু মানুষ একই সাথে একটি আত্মবোধক সত্তাও, আমি আছি – এই  বোধযুক্ত সত্তা । সে তার নিজের অস্তিত্বের অনুভুতক। আত্মচেতক, আমিত্ব সংবেদক। নিজের অস্তিত্বের, পার্থক্যের, স্বাতন্ত্র্যের অনুভূতক, নিজেকে(subject) এবং আত্মসম্পর্কিত বিষয়কে (object) অনুভব করার শক্তিময় একটি স্ব-তন্ত্র একক। আত্মসংবেদক বলেই(self reflective or self-percieving) তার চেতনায় আছে  বিষয়-বিষয়ী প্রভেদ জ্ঞান । এই বিষয়-বিষয়ী প্রভেদ জ্ঞানে স্ব-ত্ব (selfdom) এবং স্ববর্তন বৃত্তকে(world) অনুভবের শক্তিই প্রতিটি মানুষকে করে তুলেছে তার পরিবেশ থেকে, অন্যের থেকে পৃথক একটি স্বতন্ত্র একক, যে স্বানুভবশক্তিই তার ব্যক্তিত্বের ভিত্তি। আত্মসংবেদক সত্তার চিহ্ন হল ঐচ্ছিক সচেতন উদ্দেশ্যমূখী ক্রিয়া। মানুষের আছে এই ধরণের ক্রিয়াশীলতা। সুতরাং মানুষ একটি আমিত্বিক সত্তা (self-entity/being-entity), যা আত্ম সংবেদক বলেই কালোৎক্রান্তিক, কাল সংঘর্ষক, অর্থাৎ তার আছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত, তার অস্তিত্ব বিস্তৃত অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতে। জীবনের এই অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত মাত্রা মানুষের কালোৎক্রান্তিক, কাল সংঘর্ষক আমিত্বিক স্ববর্তনমূলক অস্তিত্বের অনুষঙ্গ । যে আমিত্বিক স্ব-বর্তনের শক্তিতেই অতীত ও বর্তমানের বিশ্লেষণাত্মক বীক্ষণে বর্তমানের পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানুষ ভবিষ্যতের প্রকল্পিত রূপায়ন করতে পারে।

          আমিত্ব কী? মানবদেহে আমিত্বের উৎস কারণ কী? আমিত্ব হল সত্তার চেতনিক একত্ববাচক কেন্দ্র (cognitive unity of being), বিষয়-সংবেদনার সংশ্লেষক, সত্তার সংবিত্তিক কেন্দ্র , চেতনার আত্মিক একত্ব (self-reflective subjectivity or subjective unity)। চেতনার একত্ববাচক আমিত্ব মানব দেহের চেতনিক ক্রিয়া, প্রক্রিয়াগুলির কেন্দ্রীয় সংহতি বিধায়ক সূত্র। একত্ব(singularity or unity) আর প্রতিফলকতা হল(reflectivity) আমিত্বের সারবত্তা। কি এই আমিত্বের উত্স বা কারণ? তা কি মানুষের মস্তিস্কের থেকে পৃথক, মস্তিস্কের সাথে সংযোজিত পৃথক অতিরিক্ত কোনো উপাদান?

মানুষের আমিত্ব তার দেহবস্তুরই অভিব্যক্তি। ধর্মতাত্ত্বিক ভাববাদ বস্তু ও চেতনার দ্বিত্ববাদী পৃথকীকরণে এবং দেহ ও মন – এই দুটি প্রকৃতিগত পৃথক সত্তার সম্মিলন বা সংশ্লেষণের দ্বৈতবাদী দৃষ্টিকোণে অস্তিত্বের উদ্ভব ও প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু দুটি প্রকৃতিগত পৃথক উপাদান বা সত্তার সংশ্লেষণ বা সম্মিলন কী করে সম্ভব হয়, তার সম্মিলনী আন্তঃক্রিয়াগত ভিত্তি কী তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। অন্য দিকে বস্তুবাদী একত্ববাদের দৃষ্টিকোণে চেতনা হল মানব দেহগত মস্তিস্কের বস্তুগত ক্ষেত্রের সংগঠন ও প্রকৃতি থেকে উৎপন্ন কোনো গুণ বা ক্ষমতা, অথবা বস্তুরই অন্তর্নিহিত কোনো গুণ বা ক্ষমতা, যার বিকশিত রূপটাই মস্তিস্ক। মস্তিস্কের বস্তুক্ষেত্রের ক্রিয়াগত প্রকৃতি বা বিশেষ গঠনের  মধ্যেই অন্তর্নিহিত তার উত্থানের, উদ্ভবের কারণ বা ভিত্তিভূমি। মানুষের মস্তিস্ক অসংখ্য স্নায়ু কোষের সমবায়ে গঠিত। কিন্তু স্নায়ু কোষগুলির প্রত্যেকটির পৃথক পৃথক এককত্ব বা আত্মতা বাচক একত্ব নেই। যা আছে মানব মস্তিস্কের। যার মানে মস্তিস্কের কোনো একটি বিশেষ স্থান বা কোষ মন্ডলী আমিত্বিক চেতনার অধিষ্ঠান কেন্দ্র হতে পারে না বলেই মনে হয়। বরং তা হতে পারে মানুষের মস্তিস্কের সমগ্র  স্নায়ুকোষ মণ্ডলীর অণুতারঙ্গিক আন্তক্রিয়ার সংসক্তিক ক্ষেত্র (quantum entanglement) থেকে উদ্ভূত, মস্তিস্কেরই  নিরবস্থানিক (non-spatial) চেতনিক ঐক্যশক্তি , যা মানুষের যাবতীয় অভিজ্ঞতা ও ক্রিয়ার সংবেদক, সংশ্লেষক ও উদবোধক শক্তি, মানব সত্তার আত্মবিকাশের শক্তি, প্রায়োগিক অভিযোজনের শক্তি।

          মানব সত্তার বস্তুগত ভিত্তি তার দেহ, তার দেহের বিশেষ স্বরূপ বা বাস্তবতা। এই দৈহিক বাস্তবতাই মানব সত্তার স্বরূপ অর্থাৎ মানব প্রকৃতির নির্ধারক উৎসভূমি। যা থেকে উৎসারিত মানুষের মৌলিক প্রয়োজনসমূহ এবং ঐ সব প্রয়োজন পূরণের ক্ষমতা। মানুষের দেহ বাস্তবতাগত প্রয়োজন হল খাদ্য, বিশ্রাম, চিকিৎসা, বাস স্থান, যৌনতা এবং আনন্দ। খাদ্য, বিশ্রাম, চিকিৎসা, বাস স্থান, যৌনতা হল তার দেহের বৃদ্ধি, সংরক্ষণ, সুস্থতার জন্য আবশ্যিক বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত প্রয়োজন। আর মানব দেহবস্তুর কোনো সুক্ষ্ণ গূঢ় কারণে আনন্দও তার প্রয়োজন। যে আনন্দ কী, বা তার কার্য কারণ রসায়নই বা কী তার উত্তরও মানুষের দেহবস্তুতেই নিহিত। মানুষের দৈহিক বাস্তবতাগত প্রয়োজনগুলিই মানব ইতিহাসের ভিত্তি। দেহগত বৃত্তি বা প্রকৃতি থেকে প্রয়োজন থেকে চাহিদা থেকে অধিকার থেকে শ্রম থেকে ভোগ –  এই গতি পথেই সভ্যতার বিকাশ।

 প্রকৃতিগত প্রয়োজন থেকে ভোগে পৌঁছনোর মাধ্যমটি হল মানুষের দেহগত বিভিন্ন ক্ষমতা ও বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজনমুখী প্রয়োগ ও প্রয়োগগত বিকাশ। ক্ষমতাগুলি কী? প্রথমতঃ স্নায়বিক অণুতরংগ প্রবাহী ঐন্দ্রিক সংবেদনশীলতা (neuro-sensory perceptions of the physical forms and dimensions)। যে সংবেদনশীলতা ও উদ্দেশ্যমূখী ক্রিয়া ক্ষমতা মানব দেহের স্নায়ু কোষ মণ্ডলীর, স্নায়ু কোষ তন্ত্রের সংগঠন থেকে উৎপন্ন গুণ। দ্বিতীয়ত, স্নায়ূ তন্ত্রগত প্রতিবর্ত প্রতিক্রিয়া ও আত্মসচেতন উদ্দেশ্যমূখী ক্রিয়ার ক্ষমতা (neuro-systemic reflexive reactivity and conscious self-willed activity)। তৃতীয়ত, আবেগ, ভাব ও মানস (emotions, moods amd mental states), এবং চতুর্থত, আমিত্বিকতা (selfhood)।

আমিত্বই মানব সত্তার কেন্দ্রীয় ঐক্য বিধায়ক শক্তি, বা বলা যায় মানব সত্তারই ভিত্তিভূমি, যার প্রকাশ মানুষের সংবেদনী অভিজ্ঞতায়, চিন্তার ক্ষমতায়, তার সৃজনশীলতায়, তার স্বাধীনতায়, তার শ্রমে, তার বাস্তবমূখী অভিযোজনে, নিজেকে ও নিজের সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পালটানোর সক্রিয়তায়, নিজ সত্তার উপর, নিজ আবেগ, প্রবৃত্তি, চিন্তা, অনুভূতির উপর আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতায়, দেহের ক্ষমতাগত অভিযোজনের বর্তমান সীমাকে অতিক্রম করে যাওয়ার শক্তিতে, অর্থাৎ আত্মবিকাশে, অন্য মানুষের সংগে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতায়, সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে চেতনার দ্বান্দ্বিক আন্তঃক্রিয়ায় উদ্গত, মূর্ত, সৃষ্ট চেতনারই প্রকাশক ভাষায়, এবং সর্বোপরি মানব সমাজের প্রয়োজনমুখী বিকাশের অনন্ত মুক্ত প্রক্রিয়ায়, যার নাম ইতিহাস। এই সবই প্রমাণ করে সভ্যতার ভিত্তিমূল মানুষের দেহগত সত্তার আমিত্বিক বাস্তবতাকে।

          মানুষের চেতনার দুটি বিশিষ্ট রূপ হল, একদিকে, সংবিত্তিক সংবেদন বা প্রাকৃতিক ইন্দ্রিয় চেতনা(sense-perception), যা প্রাকৃতিক উদ্দীপক বিষয়ের  অভিঘাতে  উদ্দীপ্ত ইন্দ্রিয়গত প্রত্যক্ষ চেতনা, যেখানে চেতনা নিষ্ক্রিয়, গ্রহণমূলক। অন্য দিকে আমিত্বিক চেতনার দ্বান্দ্বিক-যৌক্তিক(dialectical-rational) সক্রিয়তামূলক চিন্তন(intellectuality/thinking)। সংবেদন বা চিন্তন – উভয়েরই কার্যকারিতার ভিত্তি হল চেতনার কালোৎক্রান্তিক আমিত্বিক ঐক্য (trans-temporal unity of self-consciousness) ও আত্মপ্রতিদর্শন ক্ষমতা (self-reflectivity)। প্রাকৃতিক ও সামাজিক ঘটনার  অভিঘাত-উদ্দীপ্ত স্নায়ুকোষ মণ্ডল ও হরমোনের ক্রিয়া-বিশেষিত চেতনিক অভিজ্ঞতাই সংবেদন। আর বৈষয়িক প্রশ্ন থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বিষয়মূখী বীক্ষণ ও ধারণা গঠনের চেতনিক সক্রিয়তাই চিন্তন (intellectual-imaginative activity of objective conceptualization)।

সংবেদনে আছে সংবিত্তিক অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষতা, সেখানে চিন্তন হল পর্যবেক্ষণ, প্রতিমান, অনুমান ও স্মৃতি ভিত্তিক ধারণাগঠনের মধ্য দিয়ে বিষয়মূখী অনুসন্ধানের পরোক্ষ পদ্ধতি। সংবেদনী প্রত্যক্ষতার শূন্যস্থানেই শুরু হয় চেতনার বস্তু বিষয়ক ধারণাগঠন বা চিন্তার সক্রিয়তা। কেননা মানব চেতনায় যা সংবেদনীয় (sensible) তা অচিন্তনীয় (non-thinkable); আর যা চিন্তনীয় (thinkable), তা অসংবেদনীয় (non-sensible)। জীবনের সমস্যা বাচক, বস্তুর স্বরূপ, প্রকৃতি, প্রক্রিয়া, কার্য কারণ বিষয়ক প্রশ্ন ও তার উত্তরই চিন্তনীয়; চিন্তন প্রক্রিয়াতেই তার বিশ্লেষণ, বিচার, অনুধাবন। অন্য দিকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিভিন্ন পদার্থিক-প্রাকৃতিক রূপ ও মাত্রা এবং  ব্যক্তির আমিত্ববোধ, আত্মনন্দন অর্থাৎ তার ভাল লাগা, আনন্দ এবং ঐ নন্দন প্রাসংগিক তার যাবতীয় ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া – অস্তিত্বের নান্দনিক মেরু ও প্রতিমেরুতে মূর্ত যাবতীয় অভিব্যক্তি – হর্ষ, বিষাদ, শোক, ঈর্ষা, হিংসা, ক্রোধ,ভয়- ইত্যাদি সব কিছুই চেতনায় সংবেদ্য বিষয়-প্রসঙ্গ ও অনুষংগ (sense-content of consciousness)। মানুষের সংবেদনাগত চেতনায় বাস্তবের যে গঠনগত ও ক্রিয়াগত বিভিন্ন দিক ও তাদের আন্তঃসম্পর্কগুলি অদৃশ্য, অসংজ্ঞাত, অনুপলব্ধ, দ্বান্দ্বিক চিন্তাগত চেতনায় তা দৃশ্য, সংজ্ঞায়িত, উপলব্ধ। চিন্তার ক্ষেত্রে চেতনার বিষয় প্রসংগ হল বিভিন্ন ধারণা, স্মৃতি ও ভাব প্রতিমা। এগুলি হল চেতনার চিন্তাগত বিষয় (intellectual content of consciousness)

সংবেদনের মূলটি মানুষের দেহগত সত্তায়। তার আত্মবর্তনী দৈহিকতার বিভিন্ন ক্রিয়া বিশেষণ বৈশিষ্টে, বা প্রকৃতিতে। ক্রিয়া বিশেষণ (reactivity/responsivity) হল কোনো উদ্দীপকের অভিঘাতে মানব সত্তায় দৈহিক-চেতনিক প্রাথমিক  প্রতিক্রিয়ার বিশেষ রূপ ও ধরণ এবং  প্রতিক্রিয়াটি দেহ ক্ষেত্রে সংঘটিত দৈহিক অবস্থার পরিবর্তনবাচক কোনো বিশেষ প্রক্রিয়া ভিত্তিক। এই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সমুহই মানুষের ইচ্ছা বা অনিচ্ছামূলক সামাজিক ক্রিয়া বা কর্মের আদি নির্ধারক উত্স কারণ। মানুষের প্রবৃত্তিক আবেগ সমূহ (instinctive emotions) তার সুক্ষাতিসুক্ষ দৈহিক-চেতনিক প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া বা ক্রিয়া বিশেষণের প্রকাশ। এই সব সুক্ষাতিসুক্ষ দৈহিক-চেতনিক প্রতিক্রিয়া প্রাকৃতিক-সামাজিক পরিস্থিতিতে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার, জীবন সংগ্রামের, উদবর্তনী অভিযোজনের আবশ্যিকতার তাগিদেই উদ্গত, বিকশিত, বিবর্তিত। অর্থাৎ সুক্ষাতিসুক্ষ দৈহিক-চেতনিক প্রতিক্রিয়া বা ক্রিয়া বিশেষণগুলি পারিবেশিক আবহে দেহগত মানব সত্তার অনুবর্তন বা সাপেক্ষীকরণজাত বৈশিষ্ট। মানুষের দেহগত আমিত্বিক সত্তার এই  ক্রিয়া বিশেষণ স্বরূপটাই প্রকৃতি। যে প্রকৃতির প্রকাশ সমাজ সম্পর্কের মধ্যেও। যে প্রকৃতির আত্মনান্দনিক পরিশোধন/নিয়ন্ত্রণটাই সংস্কৃতি। রাগ একটি সংবেদনা, যার মূল নিহিত মানব সত্তার একটি বিশেষ ক্রিয়া বিশেষণে। ঐ সত্তাগত ক্রিয়া বিশেষণটির উদ্দীপনগত সংবেদনার প্রক্রিয়াবাচক কারণটি দেহগত, সংঘটক/সংবর্তক কারণটি চেতনাগত ও ঐ সংঘটনের প্রেক্ষাগত উদ্দীপক কারণটি হল ব্যক্তির জীবনের সংগে সংশ্লিষ্ট কোনো বিশেষ প্রাকৃতিক/সামাজিক পরিস্থিতি বা সম্পর্ক। যেমন, সামাজিক/প্রাকৃতিক অভিঘাতে  উদ্দীপ্ত চেতনার ক্রিয়ায়  সংঘটিত দৈহিকতার একটি বিশেষ বৃত্তি বা ক্রিয়াবিশেষণের প্রকাশ হল  রাগ এবং ঐ উদ্দীপ্ত ক্রিয়াবিশেষণের আত্মচেতনিক অভিঘাত বা অভিজ্ঞতাই হল রাগের সংবেদনা। অর্থাৎ সংবেদন হল দেহ  ক্ষেত্রে সংঘটিত প্রক্রিয়াবাচক, দৈহিক ক্ষেত্রের পরিবর্তনবাচক কোনো  ঘটনার চেতনিক অভিজ্ঞান বা অভিব্যক্তি । আর ঐ ঘটনার কারণটি হল সংশ্লিষ্ট ক্রিয়া বিশেষণের উদ্দীপন।

          সংবেদনই চেতনায় প্রাথমিক। সংবেদন চিন্তার পূর্বগামী উদবোধক। সংবেদনী অভিঘাতে চিন্তা যখন প্রবাহিত,সক্রিয় হয়, তখন চেতনায় মূর্ত হয়, আকারিত হতে থাকে – মানস। যা চেতনায় ভাব, সংবেদনা ও স্মৃতির সঞ্চয়। সঞ্চিত(saved) ভাব, সংবেদনা, স্মৃতিমণ্ডলই মানস। 

          মানবচেতনায় অনুভূত মৌলিক সংবেদনাবলী তাদের রূপ(form), উদ্দীপন উৎস (stimuli), ও বিষয়গত (content) পার্থক্যের কারণেই পৃথক। যেমন সংবেদনের একটি বিশেষ রূপ হল ধ্বনি, যা আলো থেকে রূপ, উদ্দীপক, ও  বিষয়গত কারণেই পৃথক। ধ্বনির  উদ্দীপক হল বায়ুর কম্পন। ধ্বনি সংবেদনের  বিষয় হতে পারে বিভিন্ন ধ্বনিগত বিশেষণ। সংবেদনের রূপ নির্ভর করে সংবেদনী মাধ্যম বা ইন্দ্রিয়ের উপর। মানুষের কান ও সংশ্লিষ্ট  স্নাযুকোষ মন্ডলীই ধ্বনিরূপ সংবেদনের মাধ্যম।

চেতনায় অনুভূত সমস্ত সংবেদনকে প্রথমত তাদের রূপ, উদ্দীপক ও বিষয়ের মিল অমিলের বিচারে  দুই ভাগে ভাগ করা যায় — এক, ইন্দ্রিয় সংবেদন — দৃশ্য,ধ্বনি,গন্ধ, স্বাদ,স্পর্শ, যা প্রাকৃতিক বহির্সংবেদন, ও দুই, দেহগত অন্তর্ক্ষেত্রীয় সংবেদন। অন্তর্ক্ষেত্রীয় সংবেদনও দুই রকম, দেহগত জৈবিক (biological) সংবেদন ও দেহগত চেতনায় উদ্দীপ্ত বিভিন্ন আত্মবর্তনী আবেগ (emotions) ও আবেগাত্মক ভাব (emotional moods) সংবেদন।

ইন্দ্রিয় সংবেদন বিশ্ব বা প্রকৃতির সাথে মানব দেহের আন্তঃক্রিয়া। তা প্রকৃতির বিভিন্ন পদার্থিক মাত্রা ও গুণ বিষয়ক তথ্য। যেহেতু মানব দেহও প্রকৃতির অংশ তাই তা মানব দেহ বিষয়ক তথ্যেরও উৎস। ইন্দ্রিয় সংবেদন তাই বহিঃপ্রাকৃতিক বা বহির্ক্ষেত্রীয় সংবেদন। জৈবিক সংবেদন ও আবেগ সংবেদন দেহগত সত্তা থেকেই  উৎসারিত। জৈবিক সংবেদন হল জৈব রাসায়নিক ক্রিয়াবিশেষণ উদ্দীপ্ত দৈহিক অবস্থাগত সংবেদন, যেমন, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, যৌনতা। আবেগ সংবেদন দেহগত আমিত্বিক সত্তার ক্রিয়াবিশেষণের উদ্দীপনগত, দেহগত আত্মিক-মানসিক অবস্থার (states of being) পরিবর্তনগত অনুভুতি ।

আমিত্বিক সত্তার ক্রিয়াবিশেষণী সংবেদন দুটি পৃথক বর্গের– এক, দেহের প্রকৃতিগত প্রবৃত্তিক ক্রিয়াবিশেষণে বিজড়িত/অনুবর্তিত আমিত্বিক চেতনার বিজড়নী বিকার থেকে জাত, উদ্ভূত আত্মখণ্ডক, আত্মনাকোচক, আত্মক্লৈশিক ক্রিয়াবিশেষণগত আবেগ ও ভাব সংবেদন – যেমন, লোভ, ক্রুরতা। দুই, দেহগত প্রবৃত্তিক  ক্রিয়া বিশেষণের প্রভাব, বিজড়ন, অনুবর্তন থেকে মুক্ত আমিত্বিক চেতনার আত্মদীপ্ত, আত্মস্ফুর্ত আবেগ ও ভাব সংবেদন, যেমন, প্রেম, হর্ষ, বিষাদ, শোক, আনন্দ। আত্মিক সত্ত্বাগত এই সংবেদনসমূহের উদ্ভব হয় ব্যক্তির প্রবৃত্তিক ক্রিয়াবিশেষণগত অথবা দ্বান্দ্বিক আত্মঅভিযোজনগত সামাজিক সম্পর্কের আন্তঃক্রিয়াক্ষেত্রে।

দেহ থেকে, দেহগত আমিত্বিক বাস্তবতা থেকে, মানুষের দেহগত বিভিন্ন ক্রিয়া বিশেষণ থেকে উৎসারিত বলেই এই  সব সংবেদনা  মৌলিক। দেহ থেকে উৎসারিত বলেই এই সংবেদনা সমূহ খণ্ডমেয়াদী অর্থাৎ নির্দিষ্ট কাল ব্যাপী সংঘটমান অর্থাৎ আদি ও অন্তযুক্ত। অন্তর্মানসিক সংবেদন সমূহ ব্যক্তির চেতনায় সঞ্চিত বা সংরক্ষিত (saved or conserved) হয়। চেতনায় সংবেদনের এই সঞ্চয় বা রক্ষণ বা মুদ্রণের কারণটি হল আমিত্ব। রক্ষিত হয় বলেই অন্তর্মানসিক সংবেদন সমূহ মানব চেতনায় অনুবর্তনীয় (recurrent)। মৌলিক সংবেদনা সমূহের উৎস দেহ, কিন্তু তারা উদ্দীপ্ত হয় প্রাকৃতিক এবং সামাজিক সম্পর্ক ও পরিস্থিতির অভিঘাতে। প্রাকৃতিক এবং সামাজিক সম্পর্ক ও পরিস্থিতির অভিঘাতে উদ্দীপ্ত মৌলিক সংবেদনা সমূহের সংশ্লেষণে, সামাজিক সাপেক্ষীকরণ ও মানসিক রক্ষণে বিশেষিত হয়ে মূর্ত, সম্ভূত, উৎপন্ন হয় যৌগিক সংবেদনাগুলি, যেমন উদবেগ, ঘৃণা, বিদ্বেষ ইত্যাদি।

সামাজিক সাপেক্ষীকরণ মানে বিশেষ সামাজিক সম্পর্ক বা পরিস্থিতির সাথে বিশেষ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, আবেগ, মানসিকতার উদ্দীপনী গ্রন্থি বন্ধন বা সংবেদনী সম্পর্ক নির্মাণ, যখন কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, আবেগ, মানসিকতা কোনো সামাজিক চিহ্ন, সম্পর্ক, পরিস্থিতির অনুবর্ত রূপে চেতনায় প্রতিবর্তিত হয়। মৌলিক ও যৌগিক সংবেদনাগুলি ব্যক্তির  বিষয়মূখী মানসিকতার নির্ধারক। ব্যক্তির বিষয়মূখী বিশেষ মানসিকতাও মৌলিক ও যৌগিক সংবেদনগুলির নির্ধারক হতে পারে। মৌলিক সংবেদন ও তাদের উৎস যে সব ক্রিয়াবিশেষণ সেগুলিকে বাদ দিয়ে মানব বাস্তবতার কথা ভাবাই যায়না। তা মানবতার চিরায়ত বিশেষণ। যৌনতাহীন মানব বাস্তবতা যেমন অলীক, তেমনি অলীক ঈর্ষা, লোভ, ক্রুরতা, হর্ষ, বিষাদের অনুভূতি, ভাব ও আবেগহীন মানবতা। যদিও ব্যক্তির যৌগিক সংবেদনা সমূহ ও ঐ সংবেদনাগত মানসিকতার দিকটি সমকালীন সামাজিক সংস্কৃতি ও ব্যক্তির দ্বান্দ্বিক অভিযোজন সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল।

এই সব মিলিয়েই মানবসত্তার আত্মসংবেদ্য বৃত্ত। যা চিন্তাতীত। ঈর্ষা কী, যৌনতা কী, বিষাদ কী, আবেগ কী – তা চিন্তন ক্ষমতার চুল চেরা সূক্ষ্মতাতেও জানা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না তারা আমার চেতনায় সংবেদ্য। কিন্তু এই সব সংবেদনা ছাড়া যেমন মানবত্ব অলীক, তেমনি তাদের ভোগ মূল্যায়নী শক্তি ছাড়াও মানবত্ব অবাস্তব। আমার আমিত্বই সেই ভোগ মূল্যায়নী শক্তি। আমিই ভোক্তা – ভোগী বা দুর্ভোগী। প্রতিটি সংবেদনারই আছে তাই আমিত্বিক ভোগ্য মূল্য। যে ভোগ্য মূল্য আমিত্বেরই নন্দন প্রাসংগিক মূল্য।  আত্মনন্দনের অনুকূল, বা প্রতিকূল ভূমিকাগত মূল্য। আর তাই বিজড়িত চেতনার আত্মনাকোচক সংবেদন, যেমন, ঈর্ষা, লোভ, ক্রুরতাহীন মানব বাস্তবতা অলীক হলেও তারা মানব জীবনে অবাঞ্ছিত, নেতিবাচক। কেননা তা দেহের সুস্থতা, বিকাশ ও সুস্থিতির প্রতিকূল। তাই তাদের নিয়ন্ত্রণ, শাসন, প্রতিকার জরুরী। তাদের ছায়াপাতে আত্মনন্দন – আমার আনন্দ বিঘ্নিত। ঠিক তেমনি সেই যৌনতাই মানব জীবনে ভোগ্য, বাঞ্ছিত, যা আত্মনন্দনের অনুকূল।

          কী এই আত্মনন্দন? কেন চেতনায় ঝলসে ওঠে আনন্দের সংবেদনা? কেন আমি আনন্দিত হই?

          আমিত্ব কথাটি বহুব্যঞ্জনাময়। আমিত্ব শব্দটি অনেক সময় দম্ভ,অহংকার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কথাটি এখানে তার মূলগত অর্থেই ব্যবহৃত। আমিত্ব = আমি+ত্ব= আত্মপ্রতিফলক অস্তিত্ব, যা মানব দেহের, দেহগত প্রক্রিয়াবলীর চেতনিক ঐক্য বিধায়ক অভিযোজক শক্তি। এই আমি কি কোনো ভাষাগত/সামাজিক নির্মাণ? আমি কি কোনো ধারণা? যদি তা হয়, তাহলে সেই নির্মাণ বা ধারণার ভিত্তি কী? সেই নির্মাণ বা ধারণার কর্তা কে? সেই ধারণার উদ্ভবের প্রক্রিয়াগত কার্য কারণ কী ? তার উৎস বস্তু কী ?

আমিত্ব একাধারে উদ্দেশ্য বা ক্রিয়াবর্তক (subject) এবং বিধেয় বা ক্রিয়াবর্তিত (predicate)। আমিত্বের বিধেয় রূপটি স্থানিক-কালিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক। স্থানিক-কালিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিভিন্ন মাত্রায় আমিত্বের বিশেষায়িত রূপটিই আমিত্বিক বিধেয়, যা বিভিন্ন মাত্রায় বিশেষিত বলেই ঐ সব মাত্রার পরিবর্তন সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল। আমিত্বের এই পরিবর্তনশীল বিশেষায়িত বিধেয় (predicate) রূপটিই সভ্যতা নির্মিত। আর ক্রিয়াবর্তক আমিত্ব মানবদেহগত একটি শক্তি, যা সভ্যতার সৃজনী শক্তি। যার মানে আমিত্বের বিধেয় বিশেষিত রূপটি আসলে আমিত্বেরই ক্রিয়াবর্তক ভূমিকায় আকারীভূত, মূর্ত, নির্ধারিত,‌ বিকশিত।

আমিত্বের ভিত্তি মানুষের দেহসত্তাগত বাস্তবতা, তার দেহের বিশেষ প্রকৃতি, স্বরূপ। তার বিশিষ্ট দেহগত বাস্তবতা থেকেই আমির অংকূর, উদ্গম। ভাষা বা সামাজিক সম্পর্ক তার ভিত্তি নয়। বরং ভাষা বা সামাজিক সম্পর্কের উদ্ভব ও বিকাশের ভিত্তি হল মানুষের দেহগত আমিত্বিক সত্তা, আমিত্বিক সত্তাগত প্রয়োজন, প্রয়োজনগত স্বার্থ, স্বার্থগত লক্ষ্য ও লক্ষ্যগত ক্রিয়া। মানুষের দেহগত বাস্তবতার একটি দিক হল দেহতন্ত্রের  সংরক্ষণ, বিকাশ ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় জৈব রাসায়নিক  পরিবর্তনমূলক স্বয়ংক্রিয় দৈহিক  অভিযোজন, যা ব্যক্তির ইচ্ছানিরপেক্ষ; আর অন্য একটি দিক হল তার স্বচেতন আমিত্বিকতা, যার অভিব্যক্তি ১। সংবেদনশীলতা (sense-perceptivity), ২। চিন্তামূলক জ্ঞানবৃত্তি (knowledgeability), ৩। ইচ্ছা (will), যা দেহের জৈবিক ক্রিয়াবর্তনী বৃত্ত থেকে আমিত্বিক চেতনার সীমানিস্ক্রান্তিক বৃত্তি, অস্তিত্বের মুক্তির চালিকা শক্তি, ৪। আনন্দময়তা (aesthetic sensibility) এবং ৫। দেহমানসিক শক্তির প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণগত সচেতন, ইচ্ছামূলক ক্রিয়াভিযোজন (activity) বা শ্রমশক্তি, যা হল মানুষের, প্রাকৃতিক-সামাজিক পরিবেশ ও নিজ দেহগত সত্তা বা অস্তিত্বের উপর অভিযোজনের ক্ষমতা। মানুষের দেহগত আমিত্বিক সত্তার অভিব্যক্তি তার স্ববর্তনে , তার জ্ঞানে, তার ইচ্ছায় ও কর্মে ও তার আনন্দে । আত্মচেতক অনুভূতিশীলতা, চিন্তামূলক জ্ঞানবৃত্তি, আত্মসম্মোহিত আনন্দময়তা এবং সচেতন, ইচ্ছামূলক ক্রিয়াভিযোজন বা শ্রমশক্তির কেন্দ্রীয় ভিত্তি ও কর্তাই হল ক্রিয়াবর্তক (subject) আমি। আমিই অনুভূতক, আমিই জ্ঞাতা, আমিই নন্দিত ও আমিই শ্রমশক্তির অভিযোজক। আমিত্বহীনতায় অর্থাৎ মানবদেহের আত্মপ্রতিফলনী/আত্মপ্রতিদর্শনী কেন্দ্রহীনতায় অনুভূতি, জ্ঞান, আনন্দ এবং শ্রমই শূন্য ও অসম্ভব। মানবদেহগত ব্যক্তিত্বের কেন্দ্রীয় নির্ধারক সূত্রটিই আমিত্ব।

          আমিত্ব একজন ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তির সাথে যুক্ত করে, আবার তাকে অন্যের থেকে বিযুক্তও করে। কখন যুক্ত করে, আর কখন বিযুক্ত করে?

আমিত্ব একাধারে সাধারণ ও বিশেষ। তা মানুষের সাধারণ স্বরূপগত বাস্তবতা। প্রতিটি মানুষই আমিত্বগতভাবে এক, অদ্বৈতস্বরূপ, আমিত্বের সাধারণ স্বরূপগত বিচারে একে অপরের অদ্বৈত, অদ্বিতীয়, অভিন্ন প্রতিরূপ। প্রতিটি মানুষের অস্তিত্বের সাধারণ বাস্তবতা হল  আমিত্বচেতনিকতা ও তার বিষয়গত পরিধির একত্ব, আমিত্বিক প্রজ্ঞানশীলতা ও তার বিষয়বস্তুগত পরিধির সাধারণত্ব, আমিত্বিক অভিযোজনশীলতা ও তার বস্তুগত লক্ষ্য ও ফলাফলের অভিন্নতা এবং আত্মনান্দনিকতা ও তার অস্তিত্বগত নিয়মের একত্ব। মানুষের আমিত্বিক অদ্বৈতস্বরূপই মানুষের সাথে মানুষের মিলনের, সংযোগের, একাত্মতার সূত্র। 

কিন্তু আমিত্ব যেমন মানুষের সাথে মানুষের সাধারণীকরণ করে, তেমনি তাদের বিশেষীকরণও করে। আমিত্বই ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যের সূচক। ব্যক্তির দেহগত আমিত্বিক স্বাতন্ত্র্যবোধ যখন তাকে তার অস্তিত্বের সাধারণ অদ্বৈত স্বরূপগত বাস্তবতা থেকে বিযুক্ত, বিচ্ছিন্ন করে, তখনই সমাজে আন্তর্ব্যক্তি সম্পর্কেও  বিচ্ছিন্নতার সংক্রমণ ঘটে। ঐ বিচ্ছিন্নতায় ব্যক্তির ক্রিয়াবর্তক আমিত্ব তার কোন বিশেষ বিধেয় রূপের মধ্যে বন্দী হয়ে গেলে, সে অন্য ব্যক্তিকে তার নান্দনিক দ্বৈত রূপে, নান্দনিক দ্বৈতের প্রতিসংগী রূপে দেখা ও পাওয়ার যোগ্যতা ও ক্ষমতা হারায়।

আর যখন মানুষ তার আত্মিক অদ্বৈত স্বরূপগত বাস্তবতা-সচেতন, শুধু সচেতন নয়, তার ক্রিয়া কর্ম আচরণ ঐ বাস্তবতারই অনুসারী, তখন মানুষ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, একে অপরের নান্দনিক দ্বৈত বা  প্রতিসঙ্গী। যে দ্বৈতের ভিত্তি হল তাদের আমিত্বিক অদ্বৈত স্বরূপগত একত্ব। আনন্দ হল সংবেদক চেতনায় অদ্বৈত আমিত্বের আত্মসম্মোহনমূলক দ্বৈতায়ন (self-concentrational dualization of consciousness)। আর আন্তর্ব্যক্তি সম্পর্কের ক্ষেত্রে আনন্দ হল ভিন্ন দেহসত্তাগত সামাজিক ব্যক্তি-দ্বৈতের আমিত্বিক অদ্বৈতায়ন। আত্মসম্মোহন হল চেতনার একাগ্রীভবন বা কেন্দ্রীভবন (concentration of consciousness/attentive focusing of consciousness/focused attention of consciousness)। আত্মসম্মোহনের আবশ্যিক প্রাকশর্ত হল আকর্ষণ বা আগ্রহ (interest)। আত্মসম্মোহনের ফল হল চেতনার আত্মপ্রতিফলনী দ্বৈতায়ন (self-reflective dualization of consciousness)। অদ্বৈতের দ্বৈতায়ন বা দ্বৈতের অদ্বৈতায়ন – উভয়েরই ফল হল আত্মনান্দনিক সঙ্গ, কালবর্তনমুক্ত চেতনার অদ্বৈতমূলক দ্বৈত। অদ্বৈতমূলক দ্বৈতই আনন্দ। অদ্বৈতের আত্মসম্মোহিত দ্বৈতায়নেই আনন্দের নির্ঝর অনন্ত অবারিত। আত্মসম্মোহিত চেতনায় কালবর্তনমুক্ত দ্বৈত সঙ্গে বিভোরতাই আনন্দ। দ্বৈত সঙ্গ অর্থাৎ আমিই তখন একাধারে সংবেদক  ‘আমি’ এবং সংবেদ্য প্রতি-আমি অর্থাৎ ‘তুমি’। আমির চেতনা-দর্পণে প্রতিফলিত আমিরই প্রতিবিম্ব প্রতি-আমিত্বিক সঙ্গেই একমাত্র আনন্দ নির্বাধ মুক্ত ধারা হতে পারে। যে প্রতি-আমিত্বিক সংবেদ্য সঙ্গ সংবেদক আমিরই অভীপ্সিত বিশেষণে সুন্দর। এই আত্মপ্রতিফলিত প্রতি-আমিত্বিক সংবেদ্য সঙ্গই তার মনের মানুষ।  লালন জেনেছিলেন- এই প্রতি-আমিত্বিক নন্দন সঙ্গ পেলেই তাঁর সব যম যাতনা চলে যাবে। তিনি জেনেছিলেন তাঁর এই নন্দন সঙ্গী থাকেন এক রহস্যময় আরশি নগরে তাঁরই পড়শি হয়ে। তিনি লালনেরই কাছে থাকেন, অথচ লক্ষ যোজন ফাঁক দুজনের মধ্যে। আমির চেতনা দর্পণে প্রতিফলিত এই আত্মভোগ্য আত্মসঙ্গই রবীন্দ্রনাথেরও স্বপ্নদোসর, স্বপ্নস্বরূপিনী। সুতরাং আমিত্বই একাধারে সংবেদক ও সংবেদ্য, ভোক্তা ও ভোগ্য। আমির এই দ্বৈতায়নেই আমিত্ব নন্দন স্বতঃস্ফুর্ত স্বয়ং সম্ভব।

আমিত্ব নন্দন ঈন্দ্রিয়গত বহির্ভোগ নয়। কোন জড় উপকরণ তার প্রয়োজনীয় শর্ত নয়। সামাজিক সম্পর্কগুলি, সামাজিক সম্পর্কগত প্রতি-আমিত্বিক ব্যক্তি সম্পর্ক গুলিও আমাদের বাঞ্ছিত, কাংখিত এবং আনন্দদায়ক তখনই যখন অস্তিত্বের জড় উপকরণ শর্তকে অতিক্রম করে তাতে এই নান্দনিক দ্বৈত রূপায়িত হয়। তা সে শ্রম সম্পর্ক, যৌন সম্পর্ক, রক্ত সম্পর্ক – যাই হোক না কেন। সামাজিক সম্পর্ক যখন অস্তিত্বের জড় উপকরণ শর্তের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে এই নান্দনিক দ্বৈত হারিয়ে ফেলে তখন তা হয়ে যায় ব্যক্তির অবদমনী, ক্লেশকর, বিচ্ছিন্নতাজনক।

অদ্বৈতমূলক দ্বৈতে আমির প্রতিসঙ্গ-বস্তুটি বা তার উদবোধক, সহায়ক, অনুকূল বস্তুটিই ব্যক্তির আনন্দদায়ক প্রিয় বস্তু। আর ঐ বস্তুর প্রতি, ঐ বস্তুর আত্মপ্রতিফলনী/আত্মপ্রতিদর্শনী সঙ্গে অদ্বৈত আমির আত্মসম্মোহিত দ্বৈতায়নই প্রেম।

আন্তর্ব্যক্তি সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই নান্দনিক দ্বৈত বা প্রেমের জন্য প্রয়োজনীয়, ব্যক্তির নান্দনিক প্রতিসঙ্গ যোগ্যতার আবশ্যিক শর্ত হল স্বাধীনতা বা আত্ম নির্ধারণের ক্ষমতা। মানুষ বিভিন্ন আবেগ ও আবেগজাত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার স্রোতে ভাসছে অবিরাম। আবেগ হল প্রবৃত্তি চালিত মানসিক অবস্থা। প্রবৃত্তি হল দেহগত ক্রিয়াবিশেষণ বা বৃত্তি। প্রবৃত্তিক আবেগের স্রোতে ভাসা আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতায় বেসামাল মানুষের জীবন গড়িয়ে চলে একদিকে প্রবৃত্তিক আবেগের অনুবর্তনে, অন্যদিকে সামাজিক পরিস্থিতি, পরিবেশের চাপে। তার নিজের চেতনা ও কর্মের উপরই থাকে না তার কোনো সচেতন আত্মনিয়ন্ত্রণ। চেতনা তখন প্রবৃত্তিক আবেগগত অনুভূতির সীমায় বন্দী। প্রবৃত্তিক অনুভূতির সীমায় বন্দী বলেই বাস্তব সচেতন নয়,  অচেতন, জীবনের প্রবৃত্তিক গতি, ঘাত প্রতিঘাত, সামাজিক পরিস্থিতি, ক্ষমতা, রীতি, নীতির তলায় অবদমিত। অবদমিত মনের অচৈতন্যে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামহীন।

স্বাধীনতার প্রথম শর্ত হল, আর্থসামাজিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে সামাজিক শ্রমসৃষ্ট মূল্যের উপর একমাত্র শ্র্মাধিকার সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা‌‍; শ্র্মাধিকার ব্যতীত  বিদ্যমান যাবতীয় শ্রমসম্পর্কহীন, শ্রমাধিকার স্বত্বহীন অধিকার বা অনধিকারের অবসান। অর্থাৎ শ্রমকেই সামাজিক মূল্যের উপর অধিকারের, সামাজিক মূল্য বিনিময়ের এক ও একমাত্র সূত্র বা ভিত্তি রূপে প্রতিষ্ঠা করা।

স্বাধীনতার দ্বিতীয় শর্ত হল, মানব দেহসত্তাগত আমিত্বের দ্বান্দ্বিক-সাংস্কৃতিক বিকাশ। যে বিকাশ ঘটে ব্যক্তির দ্বান্দ্বিক আত্ম কর্ষণে। ব্যক্তির আমিত্বিক বিকাশমূখী আত্ম কর্ষণমূলক দ্বান্দ্বিক ক্রিয়াশূন্যতায় আমিত্বহীন, অচেতন, অবচেতন আমিত্বে তার দেহসত্তায় প্রভাব বিস্তার করে, সংক্রামিত হয় দেহবৃত্তীয় অনামিত্বিক জৈবিক ক্রিয়াবিশেষণগুলি। প্রেমহীনতা। প্রেম-অযোগ্যতা। নর-নারী সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা দেয় প্রেমহীন যৌনতা। ধর্ষণ প্রবৃত্তি। উচ্চতর সামাজিক অবস্থানের অপসুযোগে যৌন শোষণ ও বঞ্চনা। নারী তখন পুরুষের চোখে মনহীন যৌন ক্রীড়ার সঙ্গী/সামগ্রী ছাড়া আর কিছু নয়। নর-নারীর আমিত্বিক প্রেম-দ্বৈতে যৌন বিশেষণগত কাম বৃত্তি দেহগত কারণেই অতি আবশ্যিক একটি সুমধুর রমণীয় অনুষঙ্গ উপাদান। কিন্তু আমিত্বিক দ্বৈতহীনতায়,আমিত্বিক দ্বৈত সৃষ্টির অযোগ্যতায় যৌন বিশেষণগত কাম বৃত্তি অধঃপতিত হয় নারী বা বিপরীত যৌনতার উপর বল প্রয়োগমূলক অত্যাচারে। প্রেম ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়ায় জন্ম হয় ধর্ষকামিতার, প্রেম মানে হয়ে দাঁড়ায় কাম বৃত্তি। সুতরাং যা ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সামাজিক দ্বৈতের শর্ত, তা-ই আমিত্বিক অন্তর্দ্বৈতেরও শর্ত। এবং তাই, শেষ বিচারে, আন্তর্ব্যক্তি দ্বৈত ও আমিত্বিক অন্তর্দ্বৈত একে অপরের শর্ত।

অনামিত্বিক ক্রিয়ানুবর্তনে মানব মস্তিস্কের ক্রিয়াকরণিক চেতনিক শক্তির  সম্ভাবনা ও যোগ্যতার পূর্ণ বিকাশ ও বাস্তবায়ন ঘটতে পারে না। কারণ তখন মানুষ তার সচেতন সক্রিয়তা হারিয়ে ফেলে। দেহগত প্রক্রিয়ায় চালিত, প্রতিবর্তিত, অনুবর্তিত, অধীন, প্রভাবিত, আবিষ্ট চেতনায় সে তখন বিদ্যমান স্থিতাবস্থার মধ্যে, যা আছে তারই  মধ্যে চেতনাগত ভাবে, ক্রিয়াগত ভাবে আবর্তিত হতে থাকে, আটকে যায়। একই ধরণের, প্রাক্তন, সঞ্চিত ক্রিয়া, সংবেদনা, চিন্তা, মেজাজের কালবৃত্তে মানুষ বন্দী হয়ে যায়, যেহেতু ঐ ক্রিয়া, সংবেদনা, চিন্তা, মেজাজ মস্তিস্কে রক্ষিত বা মুদ্রিত হয়ে যায়।

কেন রক্ষিত হয় ? জৈব পদার্থিকতায় এই রক্ষণের কোন সূত্র নেই। মানব চেতনায় ঘটনা, ক্রিয়া, সংবেদনা, চিন্তা, মেজাজের রক্ষণের কারণটি হল জৈবিক ক্রিয়া বিশেষণে চেতনার বিজড়ন ও অনুবর্তন বন্দীত্ব। বিজড়িত আমিত্বই প্রাক্তন, সঞ্চিত ক্রিয়া, সংবেদনা, চিন্তা, মেজাজের অনুবর্তন বা পুনরাবর্তন ঘটায়। অর্থাৎ আমিত্বই আবর্তিত হয়; প্রাক্তন, সঞ্চিত ক্রিয়া, সংবেদনা, চিন্তা, মেজাজের কালবৃত্তে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়; অতীতের, বিদ্যমানের অনুবর্তনী সীমায় নিজেই নিজেকে আটকে ফেলে এবং প্রাক্তন, সঞ্চিত ক্রিয়া, সংবেদনা, চিন্তা, মেজাজের সাথে নিজেকে সমীকৃত ও আত্মীকৃত করে ফেলে। যে অনুবর্তন, আত্মীকরণের ফলে মানুষ তার অনুভূতি, চেতনা ও ক্রিয়ার কালোৎক্রান্তিক দ্বান্দ্বিক গতিশীলতা হারিয়ে ফেলে  —             

 নিজের ভিতর বেঁধেছ নিজেকে

                     নিজেরই হাজার পাকে,

                     হাজার আমিতে ছড়ানো যে আমি

                     কীভাবে চিনবে তাকে

                      আলোর ঝলকে যতটুকু পাও

                      সে তো শুধু অংশতঃ

                      যেখানেই যত ক্ষত জমে ওঠে

আমি সেই সব ক্ষত।  ( আমি/শংখ ঘোষ )

দ্বান্দ্বিক গতিহীনতায় অতীত এবং চলতি স্থিতাবস্থাটি ব্যক্তি ও সমাজের মাথায় চেপে বসে। ব্যক্তির অনুভূতি, চিন্তা, চেতনা, কর্ম খণ্ড কালের মেয়াদী সীমায় আবর্তিত হতে থাকে। ব্যক্তির কালোৎক্রান্তিক আমিত্বিক বিকাশ, বিবর্তন রূদ্ধ হয়ে যায়। মস্তিস্কে মর্চে ধরে যায়। মানব মস্তিস্কের গঠন-রূপটি (structural form) প্রজাতি বিবর্তনের সূত্রেই সৃষ্ট, কিন্তু তার ক্রিয়া করণিক (functional) প্রয়োগের সূত্রে মস্তিস্কের শক্তি-সম্ভাবনা, যোগ্যতার বিকাশ ব্যক্তির সচেতন আমিত্বিক ক্রিয়া বর্তন সাপেক্ষ। আমিত্বিক ক্রিয়া বর্তনে মস্তিস্কের ক্রিয়াকরণিক যোগ্যতার বিকাশ না ঘটাতে পারলে, অস্তিত্বের নান্দনিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য আবশ্যিক শর্ত, দেহগত ও চেতনাগত প্রয়োজনগুলি পূরণের চ্যালেঞ্জ নিতে না পারলে  অজ্ঞতা, মূর্খতা, অসহায়তা ও নিয়তিবাদী বশ্যতা ও নিস্ক্রিয়তার প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারই হয়ে যায় ব্যক্তির ভবিতব্য।

          মানুষের দেহবাস্তবতাগত স্বাভাবিক বৃত্তি ও ঐ স্বাভাবিক বৃত্তিগত প্রয়োজন বা আবশ্যিকতা মানুষের সমাজ সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করে এবং ঐ প্রয়োজন থেকে প্রয়োজনগত স্বার্থ থেকে স্বার্থগত লক্ষ্যের উপলব্ধি থেকে  লক্ষ্যগত ইচ্ছা থেকে ইচ্ছাগত দ্বন্দ্ব থেকে দ্বান্দ্বিক ক্রিয়াতেই ইতিহাসের ধারা বর্তিত হয়, মানব জীবন যাপনের সামাজিক নীতি রীতি পদ্ধতি বিবর্তিত হয়, সমাজের বিশেষ কালগত রূপ নির্ধারিত হয়।

মানুষের দেহবাস্তবতাগত প্রয়োজন হল – তার অস্তিত্বের দেহ ভিত্তির  পুনরুৎপাদনমূলক উদবর্তন, অস্তিত্ব-বাস্তবতার  জ্ঞানগত উপলব্ধি ও আমিত্বিক অস্তিত্বের দ্বান্দ্বিক বিকাশ। অস্তিত্বের এই মৌলিক ত্রিশর্ত বা প্রয়োজন পূরণের সাধারণ লক্ষ্য হল একটিই – আনন্দময় অস্তিত্ব, আত্মনন্দন। আত্মনন্দনই হল মানব জীবনের মৌলিকতম প্রয়োজন। আনন্দময় অস্তিত্ব বা আত্মনন্দন প্রতিষ্ঠার মৌলিকতম প্রয়োজনটি পূরণের  লক্ষ্যে মানুষের সামনে সংগ্রামও তাই ত্রিবিধ। যে সংগ্রামের চ্যালেঞ্জ তাকে নিতেই হবে।

প্রথম সংগ্রাম হল দৈহিক অস্তিত্বের পুনরুৎপাদন ও উদবর্তনের  পথ ও পদ্ধতিগত অভিযোজন মানে অর্থনৈতিক উৎপাদন, বিনিময়, ভোগ। মূল্য সৃষ্টি ও অধিকারের চ্যালেঞ্জ তাকে নিতেই হবে। দৈহিক অস্তিত্বের পুনরুৎপাদন ও উদবর্তনের  পথ ও পদ্ধতিগত অভিযোজনে হেরে যাওয়া মানেই অস্তিত্ব বিকাশের প্রথম প্রক্রিয়া বা সংগ্রামেই হেরে যাওয়া। অস্তিত্বের বিপন্নতা। এই প্রথম সংগ্রাম ও তার সাফল্য অন্য দুটি যুগপৎ ও সমান্তরাল  সংগ্রামের আবশ্যিক শর্ত।

দ্বিতীয় সংগ্রাম হল জ্ঞান বিকাশের চ্যালেঞ্জ, অর্থাৎ নেতিবাচক ক্রিয়াবিশেষণ ও আবেগের নিয়ন্ত্রণে, চেতনার দ্বান্দ্বিক কর্ষণমূলক বিকাশে, অস্তিত্বের জটিলতা ভেদ করে জীবন বাস্তবতার উপলব্ধি। চেতনার বিকাশ ঘটানোর চ্যালেঞ্জে ব্যর্থতা মানেই অজ্ঞতার অন্ধকারে অতীন্দ্রিয় কাল্পনিকতা, অসহায়তা ও নিয়তিবাদের সংক্রমণ।

তৃতীয় সংগ্রাম হল আমিত্বের দ্বান্দ্বিক বিবর্তন, মানে বিজড়িত আমিত্বের নেতিবাচক ক্রিয়াবিশেষণ থেকে মুক্তিতে আমিত্বিক অদ্বৈতের দ্বৈতায়ন। আমিত্বের বা ব্যক্তিত্বের দ্বান্দ্বিক বিবর্তন ঘটানোর চ্যালেঞ্জে ব্যর্থতা মানেই ইন্দ্রিয়গত বহির্সংবেদনা ও নেতিবাচক ক্রিয়াবিশেষণ ও সংশ্লিষ্ট সংবেদনাসমূহের বৃত্তেই ব্যক্তির সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া। অস্তিত্বের আত্মনান্দনিক সাফল্যের উচ্চতায় পৌঁছতে না পারা।

সুতরাং স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা মানে শুধুই সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়, তা মানুষের নিজের দেহগত সত্তা বা অস্তিত্বের উপরও স্বাধিকার বা আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, অর্থাৎ প্রবৃত্তিক আবেগের অনুবর্তন থেকে মুক্তিতে নিজের মন, মানসিকতা, প্রবৃত্তি ও প্রবৃত্তিক আবেগের উপর সচেতন, সক্রিয়, স্বাধীন ইচ্ছামূলক নিয়ন্ত্রণ বা অধিকার প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতা, স্বাধিকার শুধুই সামাজিক নয়, তা আত্মিক সত্তাধিকারও। আত্মিক সত্তাধিকার বা ঐ সত্তাধিকারের সংগ্রাম ব্যতীত সামাজিক স্বাধিকারের সংগ্রাম সফল হবে না। প্রবৃত্তিক অবচেতনের অন্ধকার থেকে মুক্ত না হলে সমাজ ও নিজেকে আপাতপ্রতীয়মানতার উপরিতল ভেদ করে তাদের বাস্তব স্বরূপে দেখা যাবে না। দেহগত সত্তাধিকার ও সামাজিক স্বাধিকারের সংগ্রাম, আত্মমুক্তির সংগ্রাম ও শ্রম মুক্তির সংগ্রাম একই সংগ্রামের দুটি অবিচ্ছেদ্য দিক মাত্র।

এই ত্রিবিধ চালেঞ্জের মোকাবিলায় তাই জীবন মানে হল আনন্দময় অস্তিত্ব বা আত্মনন্দন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেহগত সত্তার উপর, দেহসত্তাগত যাবতীয় বৃত্তি, প্রবৃত্তি, ইতিবাচক/নেতিবাচক ক্রিয়াবিশেষণের  উপর এবং সামাজিক সম্পর্কগত নিজ অস্তিত্বের উপর আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। পরাধীনতা, বশ্যতা, দাসত্ব সূচক সমাজ সম্পর্ক-বন্ধনের অবসানে স্বাধীনতা অর্জন, যার অন্য নাম সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতির প্রজন্মগত উত্তরাধিকার শুধু পরিবেশগত প্রভাব নয়, বরং প্রাথমিক ভাবে তা দেহগত বংশগতি সূত্রেই সঞ্চারিত। কারণ সংস্কৃতির ভিত্তি শুধুই সামাজিক নয়, বরং সংস্কৃতি  প্রাথমিক ভাবে, সূচনাগত ভাবে, ব্যক্তির দ্বান্দ্বিক-আমিত্বিক দেহ সত্তা থেকেই উদ্ভিন্ন । ব্যক্তির দেহসত্তাগত অস্তিত্বের সচেতন দ্বান্দ্বিক মন্থনেই সংস্কৃতির শুরু। ব্যক্তির দিক থেকে যার দিকে প্রথম পদক্ষেপটাই হল জীবনের বিকাশ লক্ষ্য সম্পর্কিত দ্বান্দ্বিক ক্রিয়াভিমূখ চেতনা বা বিবেকের উন্মেষ। মানুষের দেহসত্তাগত আত্মনান্দনিক অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার নিয়মই ব্যক্তির ন্যায় অন্যায় বাচক নৈতিক চেতনার উৎস। কোন কল্পিত ধারণাগত ঈশ্বর বা ধর্ম নয়। মানুষের জীবনের, ব্যক্তিত্বের আত্মনান্দনিক বিকাশের অনুকূল, সহায়ক দৈহিক, চেতনিক, সামাজিক অভিযোজনী আবশ্যিকতার চেতনা ও প্রয়োগই নৈতিকতা।

          মানব দেহসত্তাগত আমিত্বের দ্বান্দ্বিক বিবর্তনেই সম্ভব আত্মনন্দন। কেননা আত্মনন্দনের জন্য প্রয়োজনীয় আমিত্বিক দ্বৈতের বাধা আছে মানবদেহেই। তা হল জৈবিক ক্রিয়াবিশেষণে বিজড়িত/অনুবর্তিত আমিত্বিক চেতনার আত্ম খণ্ডক, আত্ম নাকোচক ক্রিয়া বিশেষণ সমূহ। যার মানে বিজড়িত আমিই নান্দনিক দ্বৈত পিয়াসী আমির বাধা। রবীন্দ্রনাথের ‘পূর্ণিমা” কবিতায় যেমন দেখি ঘরের ছোট প্রদীপের আলো ঘরের বাহিরের অবারিত পূর্ণিমার আনন্দ সংবাদকে ঘরের ভিতর ঢুকতে বাধা দেয়। আমাদের অহংই আমাদের বিশ্ব জোড়া আনন্দের নিমন্ত্রণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং অহং-এর নির্বাপণেই ঐ আনন্দ উৎসবে যোগ দেওয়া সম্ভব। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,-“ছোট্ট একটি বাতি আমার টেবিলে জ্বলছিল বলে আকাশ ভরা জ্যোৎস্না আমার ঘরে প্রবেশ করতেই পারে নি – বাইরে যে এত অজস্র সৌন্দর্য দ্যূলোক ভূলোক আচ্ছন্ন করে অপেক্ষা করছিল তা আমি জানতেও পারিনি। অহং আমাদের সেই রকম জিনিষ – অত্যন্ত কাছে এই জিনিষটা আমাদের সমস্ত বোধ শক্তিকে চার দিক থেকে আবৃত করে রেখেছে যে অনন্ত আকাশভরা অজস্র আনন্দ আমরা বোধ করতেই পারছিনে। এই অহংটার যেমনি নির্বাণ হবে অমনি অনির্বচনীয় আনন্দ এক মুহুর্তে আমাদের কাছে পরিপূর্ণভাবে প্রত্যক্ষ হবেন।”

অহং অর্থাৎ বিজড়িত আমিত্ব, যে নিজেই নিজেকে নিজের ক্রিয়া, সংবেদনা, চিন্তা, মেজাজের কালবৃত্তে, পুরাবৃত্তে খণ্ড, ক্ষুদ্র, বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। যে খণ্ডতা, ক্ষুদ্রতা, বিচ্ছিন্নতায় মানুষ আনন্দের ইচ্ছাধিকার পায় না। আনন্দ মাঝে মাঝে তাকে দেখা দেয়। যে জন্যই লালন তাঁর পড়শির এত কাছে অথচ  মাঝে লক্ষ যোজন ফাঁক। মাঝে এত ফাঁক বলেই আমাদের হৃদয় নন্দনহীনতার পাষাণই বইতে থাকে জীবনের বেশিটা সময়; রক্ত ক্ষরণে জ্বলতে থাকে বুক; অন্ধ আত্মরতির বিভ্রান্তিতে বয়ে যায় জীবন। লালনের পড়শি থাকেন আরশি নগরে, কেননা তাঁর পড়শি তারই  আত্মপ্রতিফলিত আত্মসঙ্গ। তাঁদের মধ্যে লক্ষ যোজন ফাঁক, কেননা ঐ আত্মপ্রতিফলিত আত্মসঙ্গ থেকে তিনি বঞ্চিত, বিচ্ছিন্ন, দূরবর্তী, তাঁরই বিজড়িত, খণ্ড, ক্ষুদ্র আমিত্বের বাধায়, অক্ষমতায়, অনুভূতিহীনতায়। এই বিচ্ছিন্নতা একদিকে সংবেদক আমির সংবেদনী অক্ষমতা এবং অন্যদিকে আত্ম সৌন্দর্য অর্জনে দ্বান্দ্বিক আত্মঅভিযোজনের ব্যর্থতা। বিজড়িত আমিত্বিক চেতনায় ভীড় করে থাকা হাজারো অবাঞ্ছিত অস্বস্তিকর ক্লেশজনক সংবেদনার অতলে অন্তর্লীন, অপূর্ণ, আত্মভোগ্য আত্ম সৌন্দর্য সম্ভবকে দেখতে  পাওয়া, কিন্তু তা বাস্তবায়িত করতে পারার ব্যর্থতা থেকে জাত লালনের এই দুঃখ । এই  বিজড়িত আমিত্বের বাধা থেকে, আত্ম খণ্ডক, আত্ম নাকোচক ক্রিয়াবিশেষণ থেকে মুক্তির কৃৎকলা হল আত্মসম্মোহন। আত্মসম্মোহন হল অপ্রাসঙ্গিক পার্শ্বীয় বিষয়, সংবেদনা, চিন্তা থেকে আত্ম প্রত্যাহারে  চেতনা, অনুভূতি, ক্রিয়ার বিষয়গত বস্তুমূখী কেন্দ্রীকরণ। ঠিক যেমন চেতনার লক্ষ্যভেদী ফোকাসে অর্জুন বৃক্ষ শাখার উপরে বসে থাকা পাখিটি ছাড়া অন্য কিছুই দেখতে পান না। আত্মসম্মোহনী একাগ্রতায় চেতনাকে আবৃত, অস্বচ্ছ, খণ্ডিত, অধিকার করে রাখা অপ্রয়োজনীয়, অস্বস্তিকর, ক্লেশজনক, স্থুল আবেগ, সংবেদনার আমূল নির্বাপণ, উচ্ছেদের মাধ্যমেই  চেতনায় ঝলসে উঠতে পারে জ্ঞান, অবারিত হতে পারে আত্মপ্রতিফলিত সৌন্দর্য সঙ্গ ও ঐ সঙ্গজাত আনন্দ। যখনই লালনের কথায় ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লাগে’। কিন্তু লালনের এই সাধন, অদ্বৈতের দ্বৈতায়নের সাথে শিল্পের যোগ কী?

          আমি-র আত্মসম্মোহিত দ্বৈতায়ন শিল্প নন্দনেরও মূল কথা। শিল্প নন্দন ও আমিত্ব নন্দন স্বরূপত একই।  আত্মনন্দনের বাস্তবায়ন যেমন আত্মসম্মোহনী একাগ্রতায় বিজড়িত আমিত্বের বন্ধন থেকে  মুক্ত আমিত্বিক অদ্বৈতের দ্বৈতায়নে, তেমনই শিল্প নন্দনও স্বতস্ফুর্ত, সংঘটিত ঐ একই ভাবে। তফাৎ শুধু এই যে আমিত্ব নন্দন বাস্তবায়িত হয় আত্মসম্মোহনী একাগ্রতায় আমিত্বের দ্বান্দ্বিক বিবর্তনে, বিজড়িত আমিত্বের কালবর্তনী খণ্ডত্ব এবং বন্ধন থেকে মুক্তিতে। আর শিল্প নন্দন উত্সারিত হয়  শৈল্পিক কৃৎকলায় অনুপ্রাণিত আত্মসম্মোহনের মাধ্যমে বিজড়িত চেতনার কালবর্তনী খণ্ডত্ব এবং বন্ধন থেকে সাময়িক উৎক্রান্তিগত আমিত্বিক দ্বৈতায়নে। শিল্প নন্দনের শৈল্পিক কৃৎকলায় অনুপ্রাণিত আত্মসম্মোহনে আমিত্বিক দ্বৈতায়ন স্থায়ী নয়। তা সাময়িক। সত্তাগতভাবে কাল বর্তন বন্দী চেতনা শৈল্পিক কৃৎকলায় অনুপ্রাণিত আত্মসম্মোহনে শুধুই সাময়িকভাবে কালের চেতনাগত প্রভাব থেকে মুক্ত। শৈল্পিক আত্মসম্মোহনের সমাপ্তিতে সে পুনরায় ফিরে আসে নিজ সত্তার বাস্তবতায়। যদিও অনুপ্রাণিত আত্মসম্মোহন থেকে লব্ধ সংবেদনা ও সংজ্ঞায় সমৃদ্ধ হয়ে। এই শৈল্পিক-নান্দনিক অভিজ্ঞতা ও সংজ্ঞার স্পর্শে, অভিঘাতে অনুরণিত চেতনার বিকাশমূখী গূণগত পরিবর্তন বা বিবর্তনের সম্ভবায়ন শিল্পের উপভোগ বা শৈল্পিক-নান্দনিক আত্মসম্মোহনের ফল ও উদ্দেশ্য। চেতনার গুণগত পরিবর্তন বা বিবর্তনের এই শৈল্পিক উদ্দেশ্য নান্দনিক-শৈল্পিক প্রক্রিয়ার বাহির থেকে শিল্পের অন্তর্বস্তুর সাথে সম্পর্কহীনভাবে আরোপিত কোনো উদ্দেশ্য নয়। তা মানব সত্তাগত শৈল্পিক-নান্দনিক প্রক্রিয়া ও শিল্পের অন্তর্বস্তুর স্বাভাবিক ক্রিয়াগত পরিণতি।

          অনুপ্রাণিত আত্মসম্মোহন সৃষ্টি হয় কীভাবে? অনুপ্রাণিত আত্মসম্মোহনের ভিত্তি হল মানুষের দেহসত্তাগত আমিত্বের অদ্বৈত স্বরূপ ও  সাধারণ বাস্তবতা। মানব সত্তায়, মানব জীবনে  এই আমিত্বিক সাধারণ বাস্তবতা আছে বলেই সংবেদন উদ্দীপনের শৈল্পিক কলাশৈলীতে সৃষ্টি হয় অনুপ্রাণিত আত্মসম্মোহন। এই সাধারণ বাস্তবতা না থাকলে অর্থাৎ ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির অনুভূতি, চিন্তা ও ক্রিয়াবিশেষণগত প্রভেদ, পার্থক্য, ভিন্নতাই  যদি শেষ কথা হত, তাহলে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির কোন প্রকার একাত্মীকরণ, অনুভূতিক/সংবেদনী সমীকরণই সম্ভব হতনা। সংবেদনী সমীকরণ বা সমানুভূতির সম্ভবতাই অনুপ্রাণিত আত্মসম্মোহনের দেহগত প্রায়োগিক ভিত্তি। বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে স্বভাব, মেজাজ, প্রবণতা ইত্যাদির পার্থক্য, সোজা কথায় তাদের বিশেষ ব্যক্তিত্ব তাদের দেহ প্রক্রিয়াগত পার্থক্যের প্রকাশ মাত্র। মানুষের জাতিগত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট, পার্থক্যগুলিও মানুষের প্রাকৃতিক-ভৌগোলিক পরিবেশ ও সামাজিক উৎপাদন পদ্ধতির পার্থক্য থেকে উদ্গত। এই সব পার্থক্য মানুষের দেহসত্তাগত আমিত্বিক অদ্বৈত স্বরূপের সাধারণ বাস্তবতাকে খণ্ডন করে না, তাকে বিশেষিত করে। যে বিশেষায়নে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির পার্থক্যটি আমিত্বিক সত্তার অন্তর্বস্তুগত নয়, তা আমিত্বিক সত্তার নির্বিশেষ অন্তর্বস্তু স্বরূপের সমাজ ও দেহ বিশেষিত রূপের মাত্রাগত তফাৎ মাত্র। আর তাই ব্যক্তিক ও  আন্তর্জাতিক  সাংস্কৃতিক পার্থক্যগুলিকে অতিক্রম করেও সাহিত্য তথা শিল্প বিশ্বজনীন আবেদন সৃষ্টি করতে পারে মানব অস্তিত্বের আমিত্বিক অদ্বৈত স্বরূপগত সাধারণ বাস্তবতার ভিত্তিতেই। দেশ কাল নিরপেক্ষ ভাবে মানব সত্তার ক্রিয়াবিশেষণ ও ঐ ক্রিয়াবিশেষণগত মৌলিক সংবেদনাগুলি একই, যেহেতু তা দেহগত। সংবেদনাগত সংজ্ঞার বৈষয়িক বৃত্তও তাই একই। সর্বোপরি মানুষের অস্তিত্বের ত্রিবিধ মৌলিক প্রয়োজন ও প্রয়োজনগত চাহিদা ও তা পূরণের জন্য আবশ্যক করণীয় কর্মের রূপরেখাটিও বিশ্ব প্রকৃতি, মানুষের দেহগত প্রকৃতি ও আমিত্বিক বাস্তবতার একত্বের ফলে এক ও অভিন্ন। মানব জীবন তথা অস্তিত্বের এই সাধারণ বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে আছে বলেই শিল্পের আবেদন সার্বজনীন, সর্বদৈশিক ও সর্বকালিক।

          অনুপ্রাণিত আত্মসম্মোহনের প্রক্রিয়ার একদিকে শিল্পী-সংবেদক, অন্যদিকে শিল্পের উপভোক্তা-সংবেদক। উভয়ের আন্তঃক্রিয়াতেই অনুপ্রাণিত আত্মসম্মোহন প্রক্রিয়াটির সংঘটন। উভয়ের মধ্যে আন্তঃক্রিয়াতে সংঘটিত  ভোক্তা-সংবেদকের অনুপ্রাণিত আত্মসম্মোহনের প্রক্রিয়ায় শিল্প-বস্তুটি হল উপাদান-করণ এবং শিল্পী-সংবেদকের প্রতিভু প্রতিনিধি। আত্মসম্মোহন ভোক্তা-সংবেদকেরই অনুভূতির সক্রিয়তামূলক একটি প্রক্রিয়া। ভোক্তা-সংবেদকই আত্মসম্মোহিত এবং আত্মসম্মোহক। নিজেই নিজেরই দ্বারা শিল্প-বস্তুতে আত্মসম্মোহিত। আত্মসম্মোহন আত্মসক্রিয়তামূলক; আর সম্মোহন আত্মনিস্ক্রিয়তাবাচক। আত্মসম্মোহনে চেতনা সৃজনাত্মক গ্রহনশীলতায় সক্রিয়, আর সম্মোহনে চেতনা শুধুই গ্রহনশীল। আত্মসম্মোহনে চেতনা স্বাধীন, স্ববর্তনী; আর সম্মোহনে চেতনা বশীভূত, পরাধীন। শুধু শিল্প-বস্তুর ভোগ নয়, শিল্প-বস্তুর সৃষ্টিও একটি আত্মসম্মোহনমূলক প্রক্রিয়া। শিল্প-বস্তুর স্রষ্টাও শিল্পের সৃজনে তাঁর চেতনার আত্মসম্মোহনমূলক দ্বৈতায়নে একাধারে স্রষ্টা-সংবেদক ও ভোক্তা-সংবেদকের দ্বৈত ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। অর্থাৎ সৃষ্টি ও সমালোচনার সমান্তরাল প্রক্রিয়াতেই একটি শিল্প-বস্তুর সৃষ্টি। শিল্প-বস্তুর সৃজনে স্রষ্টা-সংবেদকের অনুভূত সংবেদনা উপভোক্তা-সংবেদকের চেতনায় উপভোক্তা-সংবেদকের আত্মসম্মোহনী সক্রিয়তায় প্রতিব্যক্ত/প্রতিমূর্ত হয়। কিন্তু যেহেতু স্রষ্টা-সংবেদক ও ভোক্তা-সংবেদক একই অদ্বৈত আমিত্বিক  সাধারণ বাস্তবতার অংশীদার, তাই শিল্প-বস্তুর মধ্যে নিহিত স্রষ্টা-সংবেদকের অভিপ্রেত অথবা অনভিপ্রেত বিভিন্ন অ-বাক/অমূর্ত দৃষ্টিকোণও ঐ সাধারণ জীবন-বাস্তবতার বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষায় উপভোক্তা-সংবেদকের চেতনায় সবাক অর্থময় হয়ে উঠতে পারে, অর্থাৎ সৃষ্ট শিল্প তার স্রষ্টাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

          শিল্প-বস্তুটি কোন গুণে উপভোক্তা-সংবেদকের আত্মসম্মোহনের উদবোধক উপাদান রূপে কাজ করতে পারে? শিল্প-বস্তুটি উপভোক্তা-সংবেদকের চেতনায় সংবেদন উদ্দীপনের মাধ্যমে তার আত্মসম্মোহনের উদবোধক উপাদান রূপে কাজ করে। মানব চেতনায় বিষয়-বিশ্বের প্রথম অভিঘাতটিই  সংবেদন যা অন্তর্মুখী; যার সূচনা বিন্দুটি হল কোন না কোন উদ্দীপক আর অন্তিম বিন্দুটি হল সংবেদক। উদ্দীপক আর সংবেদকের সম্মিলনেই সংবেদনের সংঘটন। সংবেদকের সংবেদনী অক্ষমতায় যেমন সংবেদন ঘটে না, তেমনি উদ্দীপকের অনুপস্থিতিতেও সংবেদন ঘটে না। কিন্তু সংবেদনই জ্ঞানের অন্তিম অধ্যায় নয়। সংবেদন হল চেতনার দ্বারে বিষয়ের প্রথম আঘাত, বা বলা যায় বিষয়-বিশ্বের সন্নিকর্ষে চেতনার প্রথম সাড়া। অতঃপর অন্তর্মুখী প্রকৃতিগত সংবেদন থেকে বহির্মুখী দ্বান্দ্বিক-যৌক্তিক চিন্তা থেকে সংশ্লেষণী সংজ্ঞায়/স্বজ্ঞায় বিষয়গত বস্তুর স্বরূপ বা বাস্তবতা অভিব্যক্ত হয়। সুতরাং সংবেদন হল চিন্তার পূর্বগামী শর্ত। আর সংবেদন থেকে সংজ্ঞা অর্থাৎ বস্তুর সম্যক জ্ঞানে পৌঁছনোর পথটাই চিন্তা। অর্থাৎ সংবেদনহীনতায় চিন্তা বস্তু বিচ্ছিন্ন, অবাস্তব এবং চৈন্তিক অভিযোজনহীনতায় মানুষ সংবেদন থেকে সংজ্ঞায় উপনীত হতে ব্যর্থ, জীবনের সংবেদনী বৃত্তেই আবদ্ধ, বিষয়ের অন্তরালে গুপ্ত অদৃশ্য বস্তুর রহস্যভেদের ব্যর্থতায় কল্পিত ধারণা বিশ্বাসের অন্ধকারে আবৃত, আছন্ন, নির্বাসিত।

          সাহিত্য তথা শিল্প উপভোক্তা-সংবেদকের চেতনায় সংবেদন উদ্দীপনের মাধ্যমেই তাকে আত্মসম্মোহনে অনুপ্রানিত করে। এই সংবেদন উদ্দীপনের প্রযুক্তিটাই শিল্পের প্রকরণ বা আংগিক, যার প্রাথমিক মাধ্যমগত রূপটি বহির্সংবেদনী ইন্দ্রিয়গত –- দৃশ্য, শ্রাব্য এবং দৃশ্য-শ্রাব্য। আর উদ্দেশ্যগত, ফলগত (resultant) রূপটি হল অন্তর্সংবেদনী, চেতনাগত,– অর্থাৎ বিভিন্ন জৈবিক ও আমিত্বিক ক্রিয়াবিশেষণগত মানসিক, অন্তর্ক্ষেত্রীয় সংবেদনার উদ্দীপনমূলক। যার মানে কোন শিল্প কর্ম শুধু দৃশ্য নন্দন বা শ্রুতি নন্দন হলেই শিল্প অভিধার যোগ্য হয়ে উঠে না; তখনই তা শিল্প হয়ে ওঠে যখন তা অন্তর্সংবেদনের আলোড়নে/মন্থনে/উদ্দীপনে উপভোক্তা সংবেদককে আত্মসম্মোহনে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

          আত্মসম্মোহন হল অনুভূতির একাগ্রীভবন, যে একাগ্রীভবনে, স্বরলিপি যেমন সাংগীতিক সুর সৃষ্টির সহায়ক প্রতিষঙ্গ উপাদান করণের কাজ করে, তেমনি শিল্প-বস্তুটি উপভোক্তা-সংবেদকের চেতনায় সংবেদনা উদ্দীপ্ত বা সৃষ্টি করে। শিল্প-বস্তুর উপভোগে উপভোক্তা-সংবেদক তাঁর চেতনার সংবেদনী বীণায় ঝংকার তোলেন শিল্প-বস্তুতে অভিব্যক্ত ও অব্যক্ত, মূর্ত ও গুপ্ত সংবেদনারাশির। তাঁর চেতনায় এই সংবেদনী সুর প্রবাহ সৃষ্টির সাফল্য নির্ভর করে তাঁর বীণার গুণ মান অর্থাৎ তাঁর চেতনার সংবেদনী ক্ষমতার উপর। এই সংবেদনী ক্ষমতার তারতম্যই বিভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই শিল্প বস্তুর উপভোগ ও অনুধাবনের তারতম্য ও বিশেষীকরণ ঘটায়।

          উপভোক্তা-সংবেদকের আত্মসম্মোহন যেমন একদিকে তারই চেতনার গুণ, মান ও সক্রিয়তা সাপেক্ষ, তেমনি সৃষ্ট শিল্প বস্তুর প্রাজ্ঞিক (truthful), মাঙ্গলিক (ethical), ও নান্দনিক (aesthetical) গুণ সৃষ্টির মাধ্যমে শিল্পী-সংবেদকের সৃজনী ভূমিকাও উপভোক্তা-সংবেদকের আত্মসম্মোহনের অন্যতম শর্ত। প্রাজ্ঞিক, অর্থাৎ অস্তিত্বের সত্য প্রকাশক। সত্য অর্থাৎ বস্তুর বাস্তবতা। বস্তুর স্বরূপ, বস্তুতে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন প্রক্রিয়া, ও তাদের কার্য-কারণ সম্পর্কের বিশ্লেষণেই বস্তুর যে সত্য প্রকাশিত। মাঙ্গলিক, অর্থাৎ অস্তিত্বের দ্বান্দ্বিক-নিস্ক্রান্তিক লক্ষ্যবাচক। স্বাধীনতা, সাম্য, মৈত্রী, প্রেম, শান্তি ও আনন্দই অস্তিত্বের দ্বান্দ্বিক লক্ষ্য। নান্দনিক, অর্থাৎ সৌন্দর্য রসানুভূতির উদ্দীপক। সুন্দর তা-ই, যা একদিকে মূর্ত প্রাকৃতিক সংবেদনী আনন্দের (sensuous pleasure) উদ্দীপক, অন্যদিকে বিমূর্ত সংজ্ঞায়নী আনন্দের (intellectual pleasure) উদ্দীপক। সংবেদনী আনন্দের আকর, উপাদান হল বস্তুর ইন্দ্রিয় সংবেদনগত বৈশিষ্ট সমূহ। সংজ্ঞামূলক আনন্দের আকর, উপাদান হল বস্তুর সংবেদনাতীত বিমূর্ত সংজ্ঞেয় বৈশিষ্ট সমূহ। আনন্দের আকর উপাদান যাই হোক না কেন, তার উৎস হল উপভোক্তার সংবেদন সংশ্লেষক আমিত্বিক চেতনা। আনন্দের বস্তুগত উপাদানের সংশ্লেষণে সৃষ্ট সৌন্দর্যে আমিত্বিক চেতনার দ্বৈতায়নী আত্মসম্মোহনমূলক আত্মবিভোরতাই আনন্দ। প্রাজ্ঞিক, মাঙ্গলিক ও নান্দনিক- এই ত্রয়ী গুণই শিল্পকর্মের শৈল্পিক যোগ্যতার মানদণ্ড।

সুতরাং শিল্পের উপভোগ স্রষ্টা ও উপভোক্তার চেতনার অদ্বৈতায়নগত দ্বৈত মুলক প্রক্রিয়া। অদ্বৈতায়নী দ্বৈত বলেই শিল্পের উপভোগ একাধারে একটি ঐক্য ও স্বাতন্ত্র্যমূলক প্রক্রিয়া। তা যেমন একদিকে শিল্পী-সংবেদক ও উপভোক্তা-সংবেদকের অনুভূতির ঐক্যমূলক, তেমনি উপভোক্তা সংবেদকের স্বাতন্ত্র্যমূলকও। অর্থাৎ শিল্পের উপভোগ হল শিল্পী-সংবেদকের সাথে উপভোক্তা সংবেদকের স্বাতন্ত্র্যমূলক বা স্ববর্তনী ঐক্য। শিল্প বস্তুর উপভোগে যদি উপভোক্তা-সংবেদকের চেতনার স্বাতন্ত্র্যমূলক ঐক্য না থাকে তবে তা তার চেতনার সমৃদ্ধি জনক না হয়ে আবেশক হয়ে যায়, তার চেতনার উপর শিল্পী-সংবেদকের চিন্তা চেতনার  আরোপণ ঘটে। যার ফলে ঐ শিল্প কর্ম চেতনা বিকাশের সহায়ক না হয়ে চেতনা বিকাশের প্রতিবন্ধক সেন্টিমেন্টের সংক্রামক হয়ে যায়।

          সুতরাং শিল্পবস্তুর আত্মসম্মোহনগত উপভোগে শিল্পী-সংবেদকের সাথে অনুভূতিগত সমীকরণ বা  ঐক্যের মধ্যেই সক্রিয় থাকে উপভোক্তা-সংবেদকের চেতনার স্বাতন্ত্র্যমূলক আত্মবীক্ষণ। যে আত্মবীক্ষণ ক্রিয়া না থাকলে শিল্পী-সংবেদকের চেতনার সাথে সংবেদনী সমীকরণগত আত্মসম্মোহনে উপভোক্তা-সংবেদকের চিন্তার বৈষয়িক সক্রিয়তা থাকে না, আত্মসম্মোহন হয়ে যায় সম্মোহন, শিল্পী-সংবেদকের চিন্তা ও চেতনার আরোপণে উপভোক্তা-সংবেদকের চিন্তা আচ্ছন্ন, অবদমিত, অন্তর্লীন, নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। চিন্তার আচ্ছন্নতা ও নিষ্ক্রিয়তায় উপভোক্তা-সংবেদক শিল্পী-সংবেদকের চেতনার সাথে তাঁর চেতনার  সমীকরণগত সংবেদনের সীমাতেই আঁটকে যান। তখন শিল্পবস্তুর উপভোগ যেমন উপভোক্তার চেতনাকে সমৃদ্ধ করতে পারে না, তেমনি তার অব্যক্ত, গুপ্ত, গূঢ় ব্যঞ্জনার্থ সমূহ তাঁর চেতনার কাছে অব্যক্ত এবং গুপ্তই থেকে যায়।

          সংবেদন হল দেহগত প্রক্রিয়ার ফলাফলগত চেতনিক অভিজ্ঞান, যা দেহগত বলেই প্রত্যক্ষ কেবলই সংবেদকের কাছে। আমার ক্ষুধায় অন্যের ক্ষুধা বোধ করা তো সম্ভব নয়। আমার দুঃখ তো অন্যের মস্তিস্কে বা চেতনায় সরাসরি প্রতিসংবিত্ত হতে পারেনা। তবু তো সাহিত্য, শিল্প আমাদের হাসায়, কাঁদায়, ভাবায় এমনভাবে, এমন সংবেদনা, আবেগ, ভাব, চিন্তার উদ্দীপনে, যা সত্তাগতভাবে আমার জীবনের অংশ নয়। তাহলে শিল্পী-সংবেদকের অনুভূত সংবেদনা কীভাবে, কোন শৈল্পিক কৃৎকলায় উপভোক্তা-সংবেদকের চেতনায় সঞ্চালিত, প্রত্যক্ষিত, অনুভূত হয়, যদিও তাদের মধ্যে কোন দেহপ্রক্রিয়াগত সংযোগে সংবেদনের সঞ্চালন ঘটে না? শৈল্পিক প্রক্রিয়ায় সংবেদনের সঞ্চালন ঘটে না, ঘটে সংবেদনের উদ্দীপন।  শিল্পকার আমাদের হাসান, কাদান, ভাবান – এমনটা না বলে, আমরা বলতে পারি তাঁর সৃষ্ট শিল্প বস্তুতে আত্মসম্মোহিত হয়ে আমরাই হাসি, কাদি, ভাবি। তাঁর সৃষ্ট শিল্প বস্তুতে আত্মসম্মোহিত হয়ে আমরা আমাদের ব্যক্তিত্বের থেকে আত্মনিষ্ক্রমণে (willing suspension of the self) চেতনাগতভাবে সমীকৃত হই অন্যের দুঃখ আনন্দ ভাবনা, জীবন-পরিস্থিতিতে। কী এই আন্তর্ব্যক্তিক সম/সহ চেতনার উদবোধনী সংবেদন উদ্দীপনের প্রযুক্তি? সংবেদনের বৈষয়িক সঙ্গ (objective correlative) বা সংবেদনী সঙ্গের যথাযথ ও উদ্ভাবনশীল রচনা ও বিন্যাসেই শিল্পস্রষ্টা উপভোক্তা-সংবেদকের চেতনায় প্রয়োজনীয়, প্রাসঙ্গিক ও যথাযথ সংবেদন প্রবাহের সৃষ্টি করেন।

          সংবেদনের বৈষয়িক সঙ্গ হল সংবেদনের সাথে সহবর্তিত কোনো উপাদান, যা হতে পারে কোনো বস্তু, চিহ্ন, সংকেত, ক্রিয়া, ঘটনা। সহবর্তন সম্পর্কের বৈশিষ্ট অনুসারে যে সঙ্গীভূত উপাদানগুলি তিন ধরনের হতে পারে,– প্রতিসঙ্গ (structural-functional correlative), উপসঙ্গ (co-incidental correlative) ও অনুষঙ্গ (post-associated correalative)। বৈষয়িক প্রতিষঙ্গ হল সংবেদনের উদ্দীপন বা উদ্ভবের কাঠামো ও প্রক্রিয়াগত উপাদান (structural-functional factors of generation or stimulation of a sense-perception), যা সংবেদনের সাথে অনিবার্য, আবশ্যিক কার্য কারণ সম্পর্কে সহযুক্ত। উপসঙ্গ হল সেই সব উপাদান যা সংবেদনের প্রক্রিয়াগত উপাদান নয়, সংবেদনের সাথে যা কোনো কাঠামোগত ও প্রক্রিয়াগত সম্পর্কহীন। যা সংবেদনের সাথে শুধুই আকষ্মিক সমাপতন সম্পর্কে যুক্ত। যা সংবেদনের সাথে সহবর্তিত না হলেও সংবেদনটি উদ্দীপ্ত বা উদ্ভূত হতে পারে। অনুষঙ্গ হল সেই সব উপাদান যা সংবেদনের সাথে সহবর্তিত হয় সংবেদনের উৎপন্ন প্রতিক্রিয়া বা ফলাফল রূপে, অর্থাৎ অনুষঙ্গ হল সংবেদনের কাঠামো ও প্রক্রিয়াগত সম্পর্কে যুক্ত সংবেদনোত্তর প্রতিক্রিয়া।

          শিল্পকার কিভাবে বুঝবেন, বেছে নেবেন, নির্বাচন করবেন কোন সংবেদনের বৈষয়িক সঙ্গগুলি কী? সংবেদনের  সাথে তার বিশেষ বৈষয়িক সঙ্গগুলি ব্যক্তির চেতনায় মূর্ত, সম্পর্কিত হয় ব্যক্তির সংবেদনী অভিজ্ঞতা ও তার উদ্ভবের বিশেষ ক্ষেত্র, পরিস্থিতি ও পরিবেশ সূত্রে। অর্থাৎ চেতনায় কোনো একটি সংবেদন মূর্ত, অভিজ্ঞাত হলে পরেই একমাত্র তার বৈষয়িক সঙ্গগুলি মূর্ত হয় ঐ সংবেদনের উদ্ভব ক্ষেত্র অনুসারে। অর্থাৎ সংবেদনের সাথে সংবেদনের বৈষয়িক সঙ্গগুলি কাঠামোগত সম্পর্কে জড়িত। কারণ সংবেদনের বৈষয়িক সঙ্গগুলি সংবেদনের সাথে সহবর্তিত হয় সংবেদনী অভিজ্ঞতার উদ্ভবের বিশেষ সামাজিক, প্রাকৃতিক ও ব্যক্তিগত ক্ষেত্র, পরিস্থিতি ও পরিবেশ সাপেক্ষেই। সোজা কথায় কোনো বিশেষ সংবেদনের উদ্ভব যে বিশেষ সামাজিক, প্রাকৃতিক ও ব্যক্তিগত ক্ষেত্র, পরিস্থিতি ও পরিবেশ সাপেক্ষে, সেই বিশেষ সামাজিক, প্রাকৃতিক ও ব্যক্তিগত ক্ষেত্র, পরিস্থিতি ও পরিবেশই সংবেদনের সাথে সহবর্তিত বৈষয়িক সঙ্গসমূহেরও নির্ধারক।

 অভিজ্ঞতার উৎসক্ষেত্র অনুসারে অভিজ্ঞতা হতে পারে, সাধারণ, বিশেষ ও সহজাত। অভিজ্ঞতার  উৎসক্ষেত্রটি যখন সামাজিক ও প্রাকৃতিক, তখন তা ব্যক্তির সাধারণ অভিজ্ঞতা। যদিও এই ধরণের অভিজ্ঞতাতেও ব্যক্তির চরিত্রগত, সামাজিক শ্রেণি অবস্থানগত ও ভৌগোলিক পার্থক্য থাকে, তবু যেহেতু তা জীবনের সামাজিক ও প্রাকৃতিক ক্ষেত্র, পরিস্থিতি ও পরিবেশ থেকে উদ্ভূত, তাই তা মানুষের যৌথ, সাধারণ অভিজ্ঞতা। তাতে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির অনেক মিল। এই সাধারণ সামাজিক অভিজ্ঞতা ছাড়াও ব্যক্তির চেতনায় ঘটে তার বিশেষ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যা তার ব্যক্তিত্বের আত্মবিশেষণ নির্ধারিত অভিজ্ঞতা, যার মধ্য দিয়ে ঘটে তার ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। সহজাত অভিজ্ঞতা হল মানুষের প্রজাতিক দেহগত অভিজ্ঞতা, যা জীব বিবর্তনের সূত্রে বিকশিত মানুষের দেহতন্ত্রের জৈবিক বৈশিষ্ট নির্ধারিত অভিজ্ঞতা। কোন একটি বিশেষ সংবেদন ও তার বৈষয়িক সঙ্গগুলি ব্যক্তির জীবন অভিজ্ঞতার এই তিন উৎসক্ষেত্রের সঙ্গে কাঠামোগতভাবে সম্পর্কিত।

          অভিজ্ঞতার এই তিন উৎস ক্ষেত্র অনুসারেই সংবেদনের বৈষয়িক সঙ্গও তিন ধরনের, ১।  সামাজিক-প্রাকৃতিক সাধারণ অভিজ্ঞতামূলক বৈষয়িক সঙ্গ, ২। ব্যক্তির বিশেষ অভিজ্ঞতামূলক বৈষয়িক সঙ্গ ও ৩। সহজাত অভিজ্ঞতামূলক সঙ্গ। এই তিন ধরণের বৈষয়িক সঙ্গের প্রাসঙ্গিক ও নিপুণ ব্যবহার, বিন্যাস ও সংশ্লেষণের মাধ্যমেই স্রষ্টা শিল্পী তাঁর অনুভূত সংবেদনী অভিজ্ঞতাসমূহকে শিল্পের রসগ্রাহী ভোক্তা-সংবেদকের চেতনায় প্রসারিত, সঞ্চারিত করতে পারেন। সংবেদনের বৈষয়িক সঙ্গই সাহিত্য, শিল্পে বাস্তববাদের ভিত্তি। সত্তাগত (authentic) সংবেদন ও সংবেদনের যথাযথ বৈষয়িক সঙ্গবাচক পরিপ্রেক্ষিত রচনাই বাস্তববাদের অন্তর্বস্তু। যথাযথ বৈষয়িক সঙ্গবাচক পরিপ্রেক্ষিতে সত্তাগত সংবেদনার স্থাপনই শৈল্পিক বাস্তববাদ। সংবেদনার বস্তুগত পরিপ্রেক্ষায়নই (contextualization) শিল্প।

কিন্তু সংবেদন হল মানুষের বস্তু-বীক্ষার, উপলব্ধির, জীবনকে দেখা, বোঝার, প্রথম ধাপ। সংবেদন(perception) হল চেতনায় বিষয়ের প্রত্যক্ষ অভিঘাত, বিষয়ের প্রত্যক্ষ চেতনা, স্নায়ুগত ইন্দ্রিয়ের উদ্দীপনগত চেতনা, অথবা জৈব রাসায়নিক হরমোনের ক্রিয়াগত মানসিক প্রভাব, অনুভুতি, মেজাজ । বিষয়ের সাথে  দেহগত ইন্দ্রিয়ের  সন্নিকর্ষ বা আন্ত:ক্রিয়াতেই উত্সারিত সংবেদন। মস্তিস্কে নির্দিষ্ট সংবেদন কেন্দ্রের সাড়া। সংবেদনের মাধ্যমে আমরা জানি বাহিরের জগতকে এবং আমাদের দেহগত অন্তর্জগতটাও। সংবেদন মানে দেহের বাহিরের জগতটার অভিজ্ঞতা এবং দেহগত অন্তর্জগতেরও অভিজ্ঞতা। অন্তর্জগতের অভিজ্ঞতা অর্থাৎ দুঃখ বেদনা আনন্দ ভয় ইত্যাদি আবেগাত্মক অনুভুতির জগতটা। সংবেদন হল ইন্দ্রিয়গত গ্রহণমূলক একটি প্রক্রিয়া, যাতে বস্তুর, জীবনের পূর্ণ বাস্তবতার চিত্র চেতনায় ধরা পড়েনা। সংবেদন আমাদের বস্তুর একটি আভাস দেয় মাত্র। তাতে বস্তুর, জীবনের কার্য কারণ সমন্বিত প্রকৃত চিত্র ধরা পড়েনা। সংবেদন যেহেতু প্রকৃতির সাথে, বস্তুর সাথে আমাদের দেহতন্ত্রের বিশেষ বৈশিষ্টগত একটি আন্তঃক্রিয়ামূলক প্রক্রিয়া, তাই তা আমাদের ইন্দ্রিয়ের জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতার কারণেই বস্তুর বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র দিতে পারেনা। সংবেদন জ্ঞানের প্রথম ধাপ। তা বস্তুর উপস্থিতি ও তার কিছু পদার্থিক গুণবাচক অভিজ্ঞান।

এই সংবেদনী সীমাবদ্ধতায় বস্তু সম্পর্কিত জ্ঞানের অসম্পূর্ণতার শূন্যস্থান পূরণ করে আমিত্বিক চেতনার বস্তু বীক্ষণমূলক সংজ্ঞায়নী সক্রিয়তা বা  চিন্তা। সংবেদন ও আমিত্বিক চেতনার সক্রিয়তাগত  চিন্তন – এই দুয়ে মিলেই চেতনায় বস্তুর বাস্তবতার উপলব্ধি বা সংজ্ঞায়ন বা বিষয়ের অন্তর্নিহিত, বিষয়গত বাস্তবতার উপলব্ধি। সংবেদন থেকে সংজ্ঞায়নে পৌছানোর পথ বা প্রক্রিয়াটিই চিন্তা‍‌। আর চিন্তা পদ্ধতির সূক্ষতা ও গভীরতা সাপেক্ষেই সংজ্ঞায়নের যথার্থতা ও সম্পূর্ণতা।

          সংজ্ঞায়ন (cognition) হল  চিন্তামূলক সক্রিয়তায় সংবেদন লব্ধ তথ্যের বিচার-বিশ্লেষণ-সংশ্লেষণে সংবেদ্য বিষয় বা বস্তুর পূর্ণতর পরিচয় লাভ। চিন্তা হল চেতনার সংজ্ঞায়নী সক্রিয়তা । যে সংজ্ঞায়নী সক্রিয়তার প্রাথমিক উপাদান হল  বস্তু ও বস্তুর গুণাবলীর অস্তিত্ব বাচক সংবেদ (percept)  ও  সংবেদনী মানসরূপ বা  প্রতিমা (image)। প্রতিমা হল চেতনায় বস্তুর সংবেদনী ছাপ, যা  স্বতস্ফুর্ত এবং যাতে বস্তু বা বস্তুর বিভিন্ন দিক পার্থক্য বাচক পরিচয়ে চিহ্নিত, যা বস্তুর চেতনিক প্রতিকল্প (subjective-cognitive reflection)। বস্তুর প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণগত সংবেদনী তথ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে বস্তু বিষয়ক ভাবকল্প বা প্রত্যয় বা ধারণা (concept), যা বস্তুর স্বরূপ ও বস্তুতে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন সম্পর্ক বিষয়ক বোধ বা উপলব্ধি । অভিজ্ঞতা সৃষ্ট  প্রত্যয়গুলি মানব চেতনার চিন্তাহীন সৃষ্টি, প্রাথমিক প্রত্যয় । বস্তুর সংবেদন, সংবেদনী প্রতিমা ও বস্তু বিষয়ক প্রাথমিক প্রত্যয় – এই তিন উপাদানকে আশ্রয় করেই চেতনায় প্রথম সক্রিয় হয় চিন্তা । চিন্তা হল চেতনার বিষয়মুখী কেন্দ্রীকরণ। বস্তুমুখী পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার আন্তক্রিয়ায় গড়ে ওঠে বিভিন্ন যুক্তিমূলক  প্রত্যয় । সংবেদন, প্রতিমা ও প্রত্যয়কে আশ্রয় করে চিন্তা আরো এগিয়ে যায় । গঠিত হয় আরো নতুন নতুন প্রত্যয় । সংবেদন, প্রতিমা ও প্রত্যয়ের মাধ্যমে প্রবাহিত চিন্তার দিক ভ্রষ্টতায়, গতিহীনতায় প্রয়োজন হয়ে  পড়ে প্রত্যয়ের  বিনির্মাণ। প্রত্যয়ের নির্মাণ ও বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে চিন্তার ধারা। চিন্তার ক্রমবিকাশ।

          শিল্পীর শৈল্পিক বীক্ষার  একটা দিক সংবেদন, অন্যদিক সংজ্ঞায়ন। সংবেদনে শুরু  তাঁর যে শৈল্পিক যাত্রার, চিন্তামূলক সংজ্ঞায়নে তার সমাপ্তি। জীবন তথা বস্তুর সাথে যে শৈল্পিক অভিজ্ঞান-সম্পর্কের শুরু সংবেদনে, তারই পরিক্রমা সম্পূর্ণ হয় সংজ্ঞায়নে। তার মানে শৈল্পিক বীক্ষা বা শৈলী যেমন শুধুই চিন্তাহীনভাবে  সংবেদনসর্বস্ব বা চেতনার সংবেদনী সীমায় আবদ্ধ থাকবে না, তেমনি তা শুধুই জীবনের, বস্তুর প্রত্যক্ষ সংবেদনহীন চিন্তা বা ভাবমূলকও হবেনা। সংবেদন-সংজ্ঞায়নের অখণ্ড বীক্ষাতেই (unified sensibility) কেবল জীবনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতা ধরা পড়ে। জীবনের প্রত্যক্ষ সংবেদন শূন্যতায় যেমন চেতনার সংজ্ঞায়ন সক্রিয়তা বা চিন্তা অবাস্তব, সংজ্ঞায়ন ভ্রান্ত, তেমনি সংবেদনী সীমাবদ্ধতায়, চিন্তাহীন চেতনার সংবেদন সর্বস্বতায় জীবন তথা মানুষ জৈবিক ক্রিয়াবর্তনের নিস্ক্রান্তিহীন অন্ধগলিতে বন্দী। শৈল্পিক বীক্ষার খণ্ডায়নে (dissociation of sensibility) শিল্পী জীবনের পূর্ণ বাস্তবতাকে দেখতে পান না।

          চিন্তা বা জ্ঞানের বিষয় কি? চিন্তা বা জ্ঞানের বিষয় হল বস্তু, – বস্তুর বিবিধ আপেক্ষিক রূপ বা বিশেষ্য (entity/category), বস্তুর বিশেষণ বা গুণ সমূহ (modes/properties), বস্তুর বাস্তবতায় ঘটমান প্রভাব ও পরিবর্তন বাচক ক্রিয়া, প্রক্রিয়া, ঘটনা (actions/processes/events) এবং বস্তুর বাস্তবতায় ক্রিয়ারত বিভিন্ন সম্পর্ক সমূহ (relations)। বিশেষ্য হল বস্তুর বিবিধ বিচিত্র, বিশেষ রূপ বা প্রকাশ ।  বিশেষণ হল বস্তুর পার্থক্যসূচক পরিবর্তনশীল  বৈশিষ্ট। ক্রিয়া হল বস্তুর প্রকাশ, প্রভাব ও পরিবর্তনবাচক ঘটনা ও প্রক্রিয়া। আর সম্পর্ক হল বস্তুর বাস্তবতায় বিদ্যমান বিভিন্ন বিশেষ্য, বিশেষণ ও ক্রিয়ার পারস্পরিক আন্ত:নির্ধারণ।   চেতনায় বিশেষ্য জ্ঞাত হয়  সংবেদন ও প্রত্যয়গত সংজ্ঞা রূপে। বিশেষণ ও ক্রিয়া  জ্ঞাত হয় সংবেদনগত সংজ্ঞারূপে। আর সম্পর্ক সমূহ জ্ঞাত হয় প্রত্যয়গত সংজ্ঞারূপে। অস্তিত্বের এই চতুর্মুখী বাস্তবতার সংজ্ঞায়ন ও সংজ্ঞাপনের চেতনিক পদ্ধতির প্রতিষঙ্গ প্রকরণ হল ভাষা।

            ভাষা হল প্রতিষঙ্গ প্রকরণ অর্থাৎ চেতনিক সংজ্ঞায়নের সহায়ক প্রয়োজনীয় অস্ত্র। ভাষা চেতনা নয়। ভাষা চেতনার ধারক চিহ্ন শৃঙ্খলা। চেতনার পদচিহ্ন। প্রতিটি শব্দই চেতনায় অনুভূত কোন সংবেদনা অথবা উপলব্ধ সংজ্ঞাসূচক। চেতনা মানবদেহগত একটা শক্তি, মানব মস্তিস্কগত একটা ক্ষমতা, দেহগত আত্মসত্তা ও তার পরিবেশকে অনুভবের ক্ষমতা। ভাষা প্রয়োজনীয়, কেননা মানব-আমিত্বিক চেতনা কালোত্ক্রান্তিক হলেও ঐ চেতনার বিষয়-সংবেদনী অনুভুতি ও চিন্তা কালগতভাবে  খন্ড, মেয়াদী; আর তাই  বস্তুর সংবেদন, সংবেদনী প্রতিমা ও চিন্তাগত প্রত্যয়ও  খন্ডিত ও বিচ্ছিন্ন। এই খন্ডিত, বিচ্ছিন্ন সংবেদন, প্রতিমা ও প্রত্যয়ের সংশ্লেষণ ও  সংযুক্তিতে খন্ডতা ও বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করার আমিত্বচেতনিক প্রযুক্তিই হল ভাষা। এই প্রযুক্তির গঠন প্রকরণের প্রাথমিক একক হল শব্দ, যা এক একটি খন্ড বিচ্ছিন্ন সংবেদনী প্রতিমা ও প্রত্যয়ের নির্দেশক বা সূচক। শব্দ হল কোন সংবেদনী প্রতিমা বা প্রত্যয়ের অভিধা। যা হতে পারে কোন বিশেষ্য বা বিশেষণ বা ক্রিয়া বা সম্পর্কের দ্যোতক। শব্দের বিশেষ বিন্যাসে নির্মিত হয় বচন বা বাক, যা বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়া ও তাদের আন্ত:সম্পর্কের পর্যবেক্ষণে , বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়া ও তাদের আন্ত:সম্পর্ক প্রসঙ্গে সংশ্লেষণ ও বিশ্লেষণমূলক তথ্য, মনোভাব ও সিদ্ধান্তের প্রকাশক।

          কোন একটি উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধ হল গ্রন্থিত বাকমালা বা ভাষ্য।  বাক হল স্পস্ট উচ্চারিত মনোভাব, তথ্য, প্রত্যয়। যা ভাষ্যে উচ্চারিত নয়, অথচ তার মধ্যে পূর্ব সিদ্ধান্ত রূপে, স্বত:সিদ্ধ রূপে অথবা অনুচ্চারিত অনুসিদ্ধান্ত রূপে ক্রিয়াশীল তা নির্বাক। ভাষ্যের প্র্তিপাদ্য বিষয়কে প্রতিপন্ন করে, উন্মোচন করে যে উচ্চারিত বাক বা বচনগুলি সেগুলি হল প্রবাক। প্রবাকের অনুসিদ্ধান্ত রূপে নি:সৃত উচ্চারিত বাক হল অনুবাক।

মানব  অস্তিত্বের প্রাথমিক মৌল আদি ভিত্তি হল তার দেহ বস্তু। তার দেহবস্তুগত সত্তার প্রকৃতি বা স্বরূপের মধ্যেই নিহিত মানুষের যাবতীয় শক্তি, সংবেদনা, বৃত্তি, বৈশিষ্ট্য। এই দেহ বস্তুগত সত্তার প্রথম স্তর হল দেহ তন্ত্রের স্নায়বিক ও জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়াগত স্বত:স্ফুর্ত, বিষয়মুখী, প্রতিবর্ত প্রতিক্রিয়া। দ্বিতীয় স্তর হল উদ্দীপক বিষয়ের সাথে স্নায়বিক ও জৈব রাসায়নিক প্রতিবর্ত প্রতিক্রিয়া তন্ত্র বা ইন্দ্রিয়ের সম্পর্কে  উত্পন্ন চেতনিক সংবেদনা। সংবেদনা হল চেতনায় বিষয়ের অভিঘাতে উত্পন্ন বিষয়ের উপস্থিতি ও তার বিভিন্ন বৈশিষ্টের বিশেষ অনুভুতি। এটি হল চেতনায় জ্ঞানের প্রথম স্তর। তৃতীয় স্তরটি হল চেতনার বিষয়মুখী কেন্দ্রীকরণ বা  চিন্তা প্রক্রিয়ায়  বিষয়গত বাস্তবতার সংজ্ঞায়ন, অর্থাৎ  অস্তিত্বগত বাস্তবতায় বিদ্যমান বিভিন্ন বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়া, প্রক্রিয়া, তাদের আন্তঃসম্পর্ক সমূহের চেতনিক উপলব্ধি। যা জ্ঞানের দ্বিতীয় স্তর। চতুর্থ  স্তরটি হল আত্ম নান্দনিকতা, আনন্দানুভূতি, ভাল লাগা, সৌন্দর্যবোধ, সুন্দরের প্রতি নান্দনিক আত্মসম্মোহন বা প্রেম । পঞ্চম  স্তরটি হল সচেতন ইচ্ছাবৃত্তি, সত্তার সীমা থেকে, অস্তিত্বের বিদ্যমান অবস্থা থেকে উৎক্রান্তির প্রবণতা। ষষ্ঠ  স্তরটি হল সচেতন ইচ্ছামূলক উদ্দেশ্যমুখী ক্রিয়াবর্তন বা কর্ম, যা বস্তু বা বস্তুগত জীবন-অবস্থার পরিবর্তন সাধন।

চেতনার সংজ্ঞায়নী সক্রিয়তার ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকা কী? ভাষা হল চেতনার বিষয়গত বিকাশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, বা পদ্ধতি। দেহগত আমিত্বিক চেতনার আন্তর্দ্বৈত সামাজিক সংযোগ ও বিষয়গত বীক্ষণের আত্মসংজ্ঞায়নী হাতিয়ার। যে বীক্ষণের ফলাফলে চেতনাই সমৃদ্ধ ও বিকশিত।

আত্মসংজ্ঞায়নী অস্ত্র রূপে ভাষার উদ্ভবের কারণ মানবচেতনায় অনুভূতির বৈষয়িক খণ্ডতা। অবিচ্ছিন্ন একত্বে, সমগ্রতায় বস্তুর অভিজ্ঞানে অক্ষমতা। যার কারণ অনুভূতির কালগত সীমাবদ্ধতা। যে সীমাবদ্ধতায় মানুষ কোন বিষয়কে তার বস্তুগত স্বরূপের সমগ্রতায় একই সাথে, একই কালে উপলব্ধি করতে পারে না। বিষয়ের এক একটা দিক একটু একটু করে, বিচ্ছিন্নভাবে, পৃথক পৃথকভাবে, আলাদা আলাদাভাবে তার চেতনায় অনুভূত, সংজ্ঞাত হয় এবং ঐ খণ্ড খন্ড অনুভূতি, সংজ্ঞার সংশ্লেষণ-বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সে বস্তু সম্পর্কে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। যেমন একজন অন্ধ মানুষ একটি হাতির আকার আকৃতি বুঝতে পারে একমাত্র তার গায়ে হাত বুলিয়ে তার খণ্ড খণ্ড, বিচ্ছিন্ন স্পর্শ সংবেদনাগুলির সংশ্লেষণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে। ভাষা হল এই খণ্ড খণ্ড বৈশেষিক অনুভূতি ও সংজ্ঞার প্রতীক-প্রতিন্যাসী ধারক ও তার সংশ্লেষণ-বিশ্লেষণী পদ্ধতি।

অনুভূতির খণ্ডতার কারণ হল স্নায়ু তরঙ্গের কালমেয়াদী সীমা বা খণ্ডতা। যার কারণে মানব চেতনায় বিষয়ের সংবিত্তিক বীক্ষণও মেয়াদী বা খণ্ডক্রমিক। অন্ধকারে আলোর ঝলকের মত। যে আলোর ঝলকগুলির সংশ্লেষণ-বিশ্লেষণের মাধ্যমেই আমরা চেষ্টা করি বস্তুর অখণ্ড চিত্রটি পাওয়ার।

অনুভূতির এই খণ্ডতার কারণেই চেতনায় বস্তুর বোধগম্যতা বিশেষ্যভিত্তিক। বিশেষ্য অর্থাৎ চেতনায় আভাষিত বস্তুর বা বস্তুর স্বরূপগত বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যসূচক, পরিচয়বাচক সনাক্তকরণী অভিধা। বিশেষ মানেই বস্তুর ভিন্নতা, ভেদ, পার্থক্য। ভিন্নতা, ভেদ, পার্থক্য মানেই বস্তুর স্ব-ত্ব। বস্তুর স্ব-ত্ব মানে বস্তুর গঠনগত, ধর্মগত, স্বরূপগত, তার অস্তিত্বের কারণগত অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট। বস্তুর যে স্ব-ত্বই তার সাথে অন্য বস্তুর ভিন্নতার ভিত্তি বা উৎস। সুতরাং বিশেষ্য হল বস্তুর ভিন্নতা ও স্ব-ত্বসূচক সংজ্ঞা, বস্তুর চেতনিক প্রতিফলন। আর তাই বিশেষ্যের উপলব্ধি একদিকে বস্তুর বিশেষণগত পার্থক্য ও অন্যদিকে তার স্বরূপগত স্ব-ত্বের উপলব্ধিতেই সম্পূর্ণ। বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়া ও তাদের আন্তসম্পর্কের চেতনিক সংজ্ঞায়নই ভাষ্য। শব্দ বা চিহ্ন হল বস্তুর প্রতিফলক যে বিমূর্ত বিশেষ্য সংজ্ঞা তার ইন্দ্রিয়-সংবেদনী, মূর্ত, প্রতিভাষক প্রতিন্যাস, বা প্রতীক। শব্দ হল  বিশেষ্য সংজ্ঞার প্রতিফলক, প্রতিষঙ্গ ধারক ও প্রতিবর্তনী উদ্দীপক মাত্র। যে প্রতিফলক প্রতিন্যাসের প্রয়োজনীয়তার কারণ হল মানবচেতনায় বিষয়মূখী অনুভূতির  কালমেয়াদী খণ্ডত্ব।  সুতরাং ভাষা হল মানুষের খণ্ডচেতনার সংশ্লেষণী প্রযুক্তি, চেতনার কাল মেয়াদী খণ্ডত্বকে অতিক্রম করার সহায়ক কৃৎকলা। বস্তুর বোধগম্যতার লক্ষ্যে খণ্ডবাচক বিশেষ্য সংজ্ঞার সংশ্লেষণী চেতনিক সক্রিয়তার সহায়ক প্রতিষঙ্গ শৃংখলা। এবং এই শৃংখলায় ভাষার গঠনতান্ত্রিক নিয়মাবলী, অর্থাৎ ভাষিক কাঠামোর বিভিন্ন গাঠনিক উপাদানের অর্থায়ন-প্রকরণগত বৈশিষ্ট, ভুমিকা ও আন্তর্সম্পর্ক বস্তুরই বাস্তবতার অনুসারী ও প্রতিফলক।

ভাষা প্রতিন্যাস-প্রতীকী বলেই সংজ্ঞাপনী ভূমিকায় তা চেতনার সাথে সরাসরি কোনো কথা বলতে পারে না। ভাষা প্রতীকী বলেই ভাষা ও চেতনার মধ্যে একটি ব্যবধান থাকে। ঐ ব্যবধান বা শূন্যতাকে অর্থপূর্ণ করে তোলে চেতনারই অর্থায়নী সক্রিয়তা। ভাষা বা ভাষ্যের অর্থায়ন চেতনানিরপেক্ষ কোনো যান্ত্রিক, স্বতস্ফুর্ত প্রক্রিয়া নয়। অর্থ হল বাস্তব বিষয়ক তথ্য বা তত্ত্বের চেতনিক উপলব্ধি, অনুধাবন। এই উপলব্ধি ভাষার আধারে সঞ্চিত, সংরক্ষিত থাকে। ভাষা আন্তর্চেতনিক সংজ্ঞায়ন ও সংজ্ঞাপনের মাধ্যম মাত্র। ভাষার মধ্যস্থতায় বস্তু বিষয়ক তথ্য বা তত্ত্বগত উপলব্ধির চেতনান্তর সঞ্চালন বা প্রবাহেই ঘটে অর্থায়ন। ভাষা যে অর্থায়নের একটি নিস্ক্রিয় প্রতিষঙ্গ হাতিয়ার মাত্র। চেতনাই সেই হাতিয়ার ব্যবহার করে সচেতন সক্রিয়তায় ভাষার অর্থায়ন করে, অর্থাৎ ভাষিক চিহ্নে বিধৃত চেতনাগত তত্ত্ব বা তথ্যকে চেতনায় পুনরুদ্ধার করে। এই অর্থায়নী  সক্রিয়তা চেতনার গুণগত আপেক্ষিকতা সাপেক্ষ। চেতনার গুণগত আপেক্ষিকতা অর্থাৎ অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও গভীরতা। যে সূক্ষ্মতা ও গভীরতায় উপলব্ধ হয়, সংজ্ঞায়িত হয় অভিজ্ঞাত জীবন বাস্তবতার স্বরূপ, তাতে নিহিত বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়া-প্রক্রিয়াসমূহ।

অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও গভীরতা ব্যক্তির দেহ ও তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন সাপেক্ষ। দেহ যেহেতু ব্যক্তির জীবনের প্রাক-সামাজিক প্রাথমিক ভিত্তি ও প্রজন্মগত উত্তরাধিকার, তাই ব্যক্তির চেতনিক সূক্ষ্মতা, গভীরতা বিশেষণের প্রাথমিক ভিত্তিটুকু পিতা-মাতার থেকেই প্রাপ্ত। কিন্তু প্রজন্মসূত্রে পাওয়া দেহ কোনো অনড় অপরিবর্তনীয় কিছু নয়। মানুষের দেহ তার দেহধর্ম অর্থাৎ জৈব-পদার্থিকতা, চেতনিকতা, ক্রিয়াশীলতা ও নান্দনিকতা অনুসারেই তার প্রাকৃতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গে উদ্দীপন-সংবেদন-ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সূত্রে স্পন্দমান এবং একাধারে বিশেষিত ও বিশেষক, পরিবর্তিত ও পরিবর্তক, ক্রিয়াবর্তিত ও ক্রিয়াবর্তক, নিয়ন্ত্রিত ও নিয়ন্ত্রক। অর্থাৎ যে দেহসূত্রে ব্যক্তি অনুভূতিশীল, সেই দেহের সূত্রেই তার অনুভূতিশীলতা তার প্রাকৃতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহে অভিযোজ্য, অনুবর্তিত অথবা অভিযোজক, প্রবর্তক। যার মানে ব্যক্তির প্রজন্মগত দৈহিক উত্তরাধিকারও তার পিতা-মাতার জীবনের প্রাকৃতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহ ও ঐ আবহের সংগে তাদের অনুবর্তন অথবা অভিযোজনের ফলাফল। আর এইখানেই মানুষের বিকাশে সামাজিক সংস্কৃতির গুরুত্ব। মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিযোজনী ক্রিয়াই তার বিকাশের চালিকাশক্তি। সুতরাং দেহের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির জীবনের প্রাকৃতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহই তার ব্যক্তিত্ব ও জীবনের প্রাথমিক নির্ধারক। আর চুড়ান্ত নির্ধারক তার অভিযোজনী ক্রিয়া অর্থাৎ সক্রিয় সচেতন কর্ম। যে অভিযোজন ক্রিয়ার লক্ষ্য হল তার প্রাকৃতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহের কাম্য পরিবর্তন সাধন, যা তার জীবনের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অনুকূল আবহ রচনা করবে।

ব্যক্তির চেতনার অর্থায়নী/সংজ্ঞায়নী সক্রিয়তা ও সাফল্যের শর্তই হল তার অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও গভীরতা, যা একদিকে তার দেহগত একটি ক্ষমতা ও অন্যদিকে সামাজিক সংস্কৃতিগত একটি মাত্রা। দেহগত কারণে একজন মানুষ যা অনুভব করে, যেভাবে অনুভব করে অর্থাৎ তার বিভিন্নমূখী আবেগ, সংবেদনাগত, অনুভূতিক অন্তর্মাত্রা ও তাদের ধরণ যেমন তার চেতনিক অর্থায়নী সক্রিয়তার নির্ধারক, প্রভাবক, বিশেষক, তেমনি যে সামাজিক সংস্কৃতির মধ্যে সে লালিত পালিত, সেই সংস্কৃতির ধারণা, বিশ্বাস,প্রত্যয়, মূল্যবোধ, চিন্তাকাঠামোও তার চেতনার প্রাক- সংজ্ঞায়নী ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। সোজা কথায় একজন ব্যক্তির চেতনায় যা যা বর্তমান আছে, তার ভিত্তিতেই সে তার অজানা কোনো বিষয় বা ঘটনাকে, যা তার চেতনায় ছিল না, তাকে বুঝতে চায়। অর্থাৎ তার পূর্ব ধারণা, অভিজ্ঞতা, সংবেদনা তার চেতনায় নতুন, অজ্ঞাত, অনভিজ্ঞাত কোনো বিষয় সম্পর্কে তার সংজ্ঞায়নকে প্রভাবিত, বিশেষিত করে, সীমাবদ্ধ করে। সুতরাং একদিকে ব্যক্তির অনুভূতিশীলতার মান ও অন্যদিকে তার চেতনায় অস্তিত্বের বিষয়গত উপলব্ধির পরিধি ও সীমাই তার চেতনার অর্থায়নী সক্রিয়তার স্তরভেদ, সাফল্য ও অক্ষমতার নির্ধারক, কোনো বিষয় তার বুঝতে পারা বা না পারার আদি কারণ। 

চেতনা ও অনুভূতির পূর্ব প্রভাবিত, প্রাকবিশেষিত, অতীতবর্তনী সীমা ভাঙে চেতনার, চিন্তার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে। সাহিত্য তথা শিল্পের চরিত্রই হল চেতনা ও অনুভূতির সীমা ভাঙা দ্বান্দ্বিকতায় অনুভূতির সূক্ষতা ও গভীরতাকে বাড়িয়ে তোলা এবং সেই সূক্ষতর ও গভীরতর অনুভূতিতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রেক্ষায়, বীক্ষণে জীবনের নতুন সংজ্ঞায়ন।

ভাষা ও চেতনার মধ্যে একটি অর্থব্যবধানগত শূন্যতা থাকে বলেই ভাষা বা ভাষ্যের অর্থায়ন প্রক্রিয়াটি শুধুই লেখক বা সংজ্ঞাপকের উপর নির্ভর করে না। অর্থায়ন শ্রোতা বা পাঠকের চেতনার সক্রিয়তাসাপেক্ষ বলেই তা প্রধানতঃ পাঠক বা শ্রোতারই উপর নির্ভর করে। পাঠক তার অনুভূতিশীলতার মান ও উপলব্ধির বিষয়গত সীমা ও মানসাপেক্ষেই অর্থায়ন করেন, তার সত্তাগত বোধের সীমা সম্প্রসারণের সাথে সাথে বিষয়ের গভীরতায় ঢুকতে সক্ষম হন। লেখকের রচনা যদি বস্তুর বাস্তবতাকে প্রকাশ করে, ও পাঠকও যদি ঐ বাস্তবতার সংবেদন ও সংজ্ঞায়নের অনুভূতিক যোগ্যতাসম্পন্ন হন, তাহলে লেখকের অভিপ্রেত অর্থের সাথে পাঠকের উপলব্ধ অর্থের কোনো অন্তর্বস্তুগত বিরোধ থাকে না। যদিও পাঠক লেখকের অভিপ্রেত অর্থের সবাক স্তরের ভিতরে অন্তর্লীন, অব্যক্ত, অনুবাক ও নির্বাক, এমনকি তাঁর রচনায় ব্যক্ত প্রবাক অর্থের বিরোধী অর্থও আবিস্কার করতে পারেন, যা লেখক-শিল্পীর চেতনার সচেতন সীমায় না থাকলেও, তাঁরই শিল্পবস্তুর নির্বাক বস্তুগত ন্যায়ানুসারী সম্পর্ক থেকে পাঠকের চেতনায় সৃষ্টি হতে পারে। তবে শিল্পবস্তুতে অন্তর্লীন অর্থ-দ্বন্দ্ব শিল্পবস্তুর ভাব-কাঠামোয় ক্রিয়াশীল দ্বান্দ্বিক অসংগতির প্রকাশক, যা স্রষ্টার চেতনায় জীবন-বাস্তবতাসম্পর্কিত উপলব্ধির সামাজিক-সাংস্কৃতিক বস্তুগত সীমা ও আপেক্ষিকতারই ইংগিতবাহী।

 লেখকের সৃষ্ট শিল্পবস্তুতে শব্দগত বাচিক স্তরে অনুপস্থিত ব্যঞ্জনার্থের উপলব্ধি স্রষ্টা ও ভোক্তা উভয়েরই অস্তিত্বের ভিত্তি অদ্বৈত, অখণ্ড জীবন-বাস্তবতার মৌলিক প্রসঙ্গ থেকেই উদ্ভূত হয়। কিন্তু পাঠকের চেতনা যদি বস্তুর বাস্তবতার সাথে যোগহীন হয়, জীবন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে পাঠক শিল্পবস্তুতে ব্যক্ত অব্যক্ত কোনো অর্থায়নই করতে পারে না। বরং  স্রষ্টার রচনায় শিল্পবস্তু বিরোধী কল্পিত অর্থের সংক্রমণ বা আরোপণ ঘটায়।

কিন্তু অর্থ কী? অর্থ হল সংজ্ঞায়নী/ সংজ্ঞাপনী চিহ্নক শৃংখলায় চিহ্নক উদ্দীপ্ত, অনুপ্রাণিত সংবেদনা, ভাব ও চিন্তায় বস্তুতে বিদ্যমান বিশেষ্য, বিশেষণ ও ক্রিয়া সম্পর্কের উপলব্ধি, জীবনের বস্তুগত বাস্তবতার উপলব্ধি। ভাষা হল একটি প্রতীকী চিহ্নক শৃংখলা। এই চিহ্নক শৃংখলায় কী ভাব, সংবেদনা উদ্দীপ্ত হবে, তা নির্ভর করে, যে সামাজিক সংস্কৃতিতে ঐ চিহ্নক শৃংখলার উদ্ভব তার উপর, এবং সংবেদক সাড়াদানকারী ব্যক্তির সাংস্কৃতিক অভিযোজন, তার দেহমনগত অনুভূতির মান ও তাঁর চেতনায় প্রাকসংজ্ঞাত বিষয়প্রসংগের উপর। আর তাই যে কোনো চিহ্নক শৃংখলার মতই ভাষার ব্যবহার সহজসাধ্য নয়, সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ ও বিচার-বিবেচনাসাপেক্ষ। ভাষার নিপুণ ব্যবহার সাহিত্যশৈলীর অন্যতম আবশ্যিক বৈশিষ্ট। কিন্তু শুধু ভাষা বা প্রকাশ মাধ্যমের নিপুণ ব্যবহারই সাহিত্য নয়। সাহিত্যের প্রধানতম পরিচয় তার বিষয়বস্তুতে, বস্তুগত সত্যের প্রকাশে, সত্যবাদিতায়, বস্তুগত বাস্তবতার অভিব্যক্তিতে। ভাষিক চিহ্নক শৃংখলার নিপুণ, উদ্ভাবনশীল প্রয়োগে উদ্দীপ্ত, অনুপ্রাণিত সংবেদনা, ভাব ও চিন্তায় জীবন-বাস্তবতায় বিদ্যমান বিশেষ্য, বিশেষণ ও ক্রিয়া সম্পর্কের উপস্থাপনে। ভাষার নিপুণ, নিয়ন্ত্রিত, যথাযথ ব্যবহার শুধুই ভাষিক প্রকরণগত সিদ্ধতা নয়, তা প্রধানতঃ বস্তুগত বাস্তবতার আত্মসংজ্ঞায়ন বা উপলব্ধির স্বচ্ছতা বা সুদর্শ সাপেক্ষ। এই সুদর্শই হল ভাষার নিয়ন্ত্রক। সুদর্শহীন চেতনায় ভাষা একটি পিচ্ছিল মাধ্যম, যা লেখকের নিয়ন্ত্রণ থেকে পিছলে গিয়ে তাঁর রচনায় তাঁর অনভিপ্রেত অর্থের সংক্রমণ করে। এই অনভিপ্রেত অর্থের সংক্রমণ লেখকের অবচেতনের ক্রিয়া থেকেও ঘটতে পারে। যে অবচেতনের ক্রিয়া মানেই তাঁর চেতনা বস্তুর বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত। কেননা অবচেতনের সংক্রমণ মানেই চেতনায় বাস্তবতার সু-দর্শন হয়নি।

লেখক-সংবেদক ও পাঠক-সংবেদকের মধ্যে যে চেতনিক সেতুবন্ধ তৈরী হয়, তা সম্ভব হয় উভয়েরই জীবন ও চেতনা দেহগত অস্তিত্বের একই সাধারণ নিয়ম, গঠন, প্রকৃতির অংশ বলে। ভাষার উদ্ভব ও কার্যকারিতার ভিত্তিই হল দেহগত অস্তিত্বের এই সাধারণ বাস্তবতা। এই আন্তর্ব্যক্তিক সাধারণ বাস্তবতার মিলনভূমিতেই ভাষার উদ্ভব। কিন্তু সব ব্যক্তিই এই দেহগত সাধারণ বাস্তবতার অংশ হলেও, যতক্ষণ না ব্যক্তির চেতনায় ঐ বাস্তবতা অভিজ্ঞাত হচ্ছে, ততক্ষণ ভাষা দুজন ব্যক্তির মধ্যে কোনো সংবেদনী, সংজ্ঞায়নী মিলন ঘটাতে পারে না। অর্থাৎ চেতনায় বস্তুর অভিজ্ঞতা ভাষার কার্যকারিতার ভিত্তি। বস্তুর অভিজ্ঞতা মানেই ইন্দ্রিয় সংবেদনা। ইন্দ্রিয় সংবেদনার মাধ্যমে তৈরি হয় বস্তুর মানসিক প্রতিমা (image/reflection)। চেতনায় প্রতিফলিত বস্তুর এই প্রতিমাই চিহ্নিত হয় এক একটি শব্দ দ্বারা। অর্থাৎ বস্তুর সঙ্গে ভাষা সরাসরি সংযুক্ত নয়। বস্তুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অভিজ্ঞতা, অভিজ্ঞতা তৈরি করে মানসিক প্রতিমা, আর এই প্রতিমাই চিহ্নিত হয় ভাষার চিহ্নক শৃংখলায়। তাই যে ব্যক্তির অন্তর্সংবেদনী ও বহির্সংবেদনী ক্ষমতা ও সক্রিয়তা যত বেশি, তাঁর ভাষা তত সমৃদ্ধ, তাঁর ভাষাকে ব্যবহার করার ক্ষমতাও তত বেশি। আর এই জন্যই মানুষ বাস্তবতার সংবেদনা থেকে বিচ্ছিন্ন হলে, তাঁর ভাষা তাকে আর বাস্তবতার সংগে যুক্ত করতে পারে না, বরং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আর যে যত বাস্তব সংবেদনা থেকে বিচ্ছিন্ন, তাঁর ভাষা তত অর্থহীন। আর বাস্তব সংবেদনা থেকে বিচ্ছিন্ন ভাষার মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া চিন্তাও হয়ে যায় বাস্তব বিচ্ছিন্ন। তখন লেখকের সংগে পাঠকের চেতনিক, সংবেদনী সেতুবন্ধ আর ঘটে না। সুতরাং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ভাষা যেমন দুর্বোধ্যতার সংক্রমণ করে, তেমনি জীবন-বাস্তবতার (সত্তা বাস্তবতা + সমাজ বাস্তবতা) সাথে সম্পর্কশূন্য, স্পর্শরহিত পাঠক চেতনাতেও সাহিত্য দুর্বোধ্য হয়ে যায়। লেখক পাঠক যে কোনো একজন বাস্তবতার স্পর্শ শূন্য হলেই দুজনের মধ্যে ভাবের বিনিময়ে দুর্বোধ্যতার সংক্রমণ ঘটে।

সাহিত্য, শিল্পের ব্যাখ্যা বা অর্থায়ন (interpretation) পাঠক-উপভোক্তা নির্ভর প্রক্রিয়া। পাঠকের জীবন বোধ, তাঁর সমকাল প্রসংগ তাঁর শিল্পের উপভোগ ও অর্থায়নে নতুন মাত্রা যোগ করে। পরিবর্তনশীল জীবন ও কালের প্রেক্ষাপটে অর্থায়ন তাই একটি বিরতিহীন চলমান প্রক্রিয়া। যার মধ্য দিয়ে শিল্পের গভীরতর বিশ্লেষণে তার নতুন নতুন দিক আবিস্কৃত হয়। কিন্তু এই চলমান প্রক্রিয়াটি কখনো কখনো থেমে যায়, বা তা নিয়ন্ত্রিত হয় অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় সমাজ ও রাস্ট্রে আধিপত্যকারী রক্ষণকামী শক্তির প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণে। রক্ষণকামী শক্তি অর্থায়ন প্রক্রিয়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করে তার রক্ষণকামী স্বার্থ রক্ষায়, সে তার স্বার্থের বিরোধী কোনো অর্থায়নকে দমন করে। তার নিজের স্বার্থের অনুকূল অর্থায়নটিকেই প্রকৃত অর্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। অর্থায়ন প্রক্রিয়ার উপর এই রক্ষণাধিকার প্রতিষ্ঠার ফলে জ্ঞান বিজ্ঞান গবেষণার মুক্ত স্বাধীন পরিবেশ, প্রবাহ থেমে যায়।

চেতনার আত্মসংজ্ঞায়ন ভূমিকায় ভাষা যেহেতু চেতনার আত্মপ্রতিদর্শনী (self-reflective) হাতিয়ার, চেতনিক সংজ্ঞায়নের প্রতিসঙ্গ প্রকরণ, তাই মনে হতে পারে ভাষাই চেতনার উৎস কারণ ও চেতনা তার থেকে উদ্ভূত। ভাষাই আদি আর চেতনা তার ব্যুৎপত্তি। এই দৃষ্টিকোণে ভাষাহীন চেতনা বলে কিছু হয়না। ভাষা নির্ধারক, চেতনা নির্ধারিত। ভাষা উৎপাদক, চেতনা উৎপন্ন। সভ্যতা, সংস্কৃতি তথা চেতনার এই ভাষাতাত্ত্বিক নির্ধারণবাদে গাড়িই টেনে নিয়ে চলেছে ঘোড়াকে। এই ভাষাতাত্ত্বিক নির্ধারণবাদ কি সমাজের বিকাশকে ব্যখ্যা করতে পারে? তা কি ভাষার উদ্ভব ও তার উৎস কারণকে ব্যাখ্যা করতে পারে? চেতনাহীন ভাষা বলে কোনো কিছু কি আছে? কিন্তু ভাষাহীন চেতনার বাস্তবতা আছে। আমাদের সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, উল্লাস, বিষাদ, সর্বোপরি আত্মবোধই সেই ভাষাহীন চেতনার প্রকাশ, যে ভাষাহীন চেতনাই ভাষার উৎস। ঐ ভাষাহীন চেতনার বাস্তবতা বিশ্বজনীন বলেই বিভিন্ন ভাষার প্রকরণগত, পদ বিন্যাসগত পার্থক্য থাকলেও ঐ বিশেষ পদ বিন্যাসের উদ্দেশ্যগত, অর্থায়নী ক্রিয়াগত কোনো পার্থক্য নেই। বলেই এক ভাষা থেকে অন্যভাষায় অনুবাদ বা ভাষান্তর সম্ভব হয়। ভাষা  ও চেতনার মধ্যে কোনটি আদি ও কোনটি তার ব্যুৎপত্তি–- তার নির্ণয়ে এই বিশেষ ভ্রান্তির কারণ আমিত্বিক চেতনাশক্তি ও বিষয়-চেতনার মধ্যে পার্থক্য করতে না পারা। বিষয়চেতনা হল চেতনায় উৎপন্ন বিষয়গত সংবেদন ও সংজ্ঞা। আমিত্বিক চেতনা অনুভূতক আর সংবেদন ও সংজ্ঞা ঐ চেতনায় অনুভূত বিষয়। ভাষা হল চেতনায় বিষয়গত সংজ্ঞায়নের সহায়ক প্রতিসঙ্গ প্রতিকরণ। ভাষা হল চেতনায় বিষয়গত সংজ্ঞার উৎপাদনের প্রযুক্তি, চেতনার উৎপাদক নয়।

সুতরাং আমিত্বিক চেতনাই হল সূচনাবিন্দু। এই চেতনা মানব মস্তিস্কের স্নায়ুতারঙ্গিক ক্ষেত্র থেকে উৎপন্ন একটি ক্ষমতা বা শক্তি, যা সত্ত্বার অনুভূতিক একত্বের সূত্র। এই চেতনাতেই উৎপন্ন হয় বস্তু বিষয়ক সংবেদন। সংবেদন থেকে উৎপন্ন হয় চেতনিক প্রতিমা বা প্রতিচ্ছবি। এই প্রতিমা থেকে ধারণা (concept)। সরল ধারণা তৈরি হয় বস্তু বা বিষয়ের পর্যবেক্ষণ ও বিচারের মাধ্যমে। বস্তু সম্পর্কে ধারণার ভিত্তি হল বস্তুসত্তার স্ব-ত্ব/ভেদসূচক(essential-differential) পর্যবেক্ষণ। বস্তুর স্বত্ব-সত্তা (essential identity/being) বা স্বরূপসত্তাই হল বস্তুর অস্তিত্বের ভিত্তি ও নির্ধারক এবং অন্য বস্তুর সাথে তার ভিন্নতারও ভিত্তি। বস্তু কী, তার পরিচয় তার স্বরূপসত্তায়। বস্তুর স্বরূপসত্তার পর্যবেক্ষণ ও বিচারের মাধ্যমেই চেতনায় গড়ে ওঠে বস্তু সম্পর্কিত ধারণা, যার মধ্যে একাধারে বস্তুর স্বরূপ ও ভিন্নতা প্রতিফলিত। সুতরাং বস্তু থেকে সংবেদন, সংবেদন থেকে প্রতিমা, প্রতিমা থেকে ধারণা। অর্থাৎ ধারণা বস্তুর প্রত্যক্ষ প্রতিফলক নয়। বস্তু থেকে ধারণার মধ্যবর্তী পর্যায় সংবেদন, প্রতিমা, পর্যবেক্ষণ হল ব্যক্তির চেতনার মানসাপেক্ষ। অর্থাৎ ধারণা হল  ব্যক্তির আত্মবিশেষিত বোধের দর্পণে বস্তুর পরোক্ষ প্রতিফলন। ধারণা গঠনে যে আত্মবিশেষিত দৃষ্টিকোণের প্রভাব মুক্তি ঘটতে পারে বিষয়মূখী, বস্তুনিষ্ঠ, নৈর্ব্যক্তিক পর্যবেক্ষণ ও বিচার, বিশ্লেষণের মাধ্যমে।

চিহ্নক হল ধারণার প্রতিফলক। ধারণাই চিহ্নিত (signified) হয় ভাষাগত চিহ্নক (signifier) বা শব্দের মাধ্যমে। ধারণার প্রতিফলক চিহ্নকই হল চিহ্ন (sign), অর্থাৎ চিহ্ন হল চিহ্নক ও ধারণার সম্মিলন বা সংযোগ। ধারণার সঙ্গে চিহ্নকের প্রতিফলনী সম্পর্কটি হল ঐতিহাসিক সংস্কৃতিগত। চিহ্নতন্ত্র (sign-system) অর্থাৎ ধারণা-চিহ্নক সমবায়টি কোনো ভাষিক সমাজের ঐতিহাসিক কালগত জীবন ও অভিজ্ঞতার সাথে সম্পৃক্ত একটি ক্রম-বিকাশমান প্রক্রিয়া। ধারণা ও চিহ্নকের সংযোগ সাধন বা সম্মিলনটি ঘটে ব্যক্তির চেতনায়। এই সম্মিলনেই চিহ্নকের অর্থায়ন, যা প্রথমতঃ ব্যক্তির চেতনিক সক্রিয়তাগত সামাজিক-সাংস্কৃতিক আহরণ ও দ্বিতীয়তঃ তার বস্তুসম্পর্কিত প্রত্যক্ষ সংবেদন ও সংজ্ঞামূলক সৃষ্টি সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। প্রথম ক্ষেত্রে অর্থাৎ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার সুত্রে চিহ্নক ও ধারণার সংযোগসাধন, চিহ্নক থেকে চিহ্নক প্রতিফলিত ধারণা অর্জনের প্রক্রিয়াটি গ্রহণমূলক অবরোহ প্রক্রিয়া। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ধারণা গঠন থেকে ধারণা প্রতিফলনী চিহ্নক নির্মাণের প্রক্রিয়াটি সৃজনমূলক আরোহ প্রক্রিয়া। প্রথম ক্ষেত্রে পুরনোর আবর্তন, যা আছে তারই চর্বিত চর্বণ, সংস্কৃতির সংরক্ষণ, অভ্যস্ত অনুশীলন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে নতুন সৃজন। সংস্কৃতির বিকাশ।

ভাষ্য(text) হল চিহ্ন-সমবায়। ভাষ্যের গঠনে চিহ্ন-সমবায়ের মধ্যে তিন ধরনের আন্তঃক্রিয়া সম্পর্ক ক্রিয়াশীল। চিহ্নক সংগঠনের স্তরে ক্রিয়াশীল ব্যাকরণগত সম্পর্ক (grammatical relation), যা বাক্যগঠনকারী উপাদানগুলির আন্তঃসম্পর্ক, বা সংজ্ঞাপকতা (communicativity), যার মধ্যে প্রতিফলিত অস্তিত্বের বস্তুগত ক্রিয়া-প্রক্রিয়া, বিশেষণগত বিভিন্ন মৌলিক মাত্রা ও তাদের আন্তঃসম্পর্ক সমূহ। চিহ্ন-সমবায়ের ভাষিক প্রতিপাদ্য বা প্রামাণ্যের উপস্থাপনী (narrative) স্তরে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন ধারণার যৌক্তিক আন্তঃসম্পর্ক (logical relation) বা যৌক্তিকতা। আর ভাষ্যের গভীরতম সংজ্ঞায়ন বা অর্থ বোধের (interpretive) স্তরে ক্রিয়াশীল বস্তুর সাথে ধারণার সঙ্গতি সম্পর্ক বা সত্যতা।

ব্যাকরণগত সম্পর্ক বাক্যকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। ব্যাকরণগত সম্পর্কগুলির মধ্যে প্রতিফলিত হয় জীবনের প্রাকৃতিক বাস্তবতায় বিদ্যমান, বস্তুর বিভিন্ন মৌলিক-প্রাকৃতিক গতি, মাত্রা, ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য। যেমন ক্রিয়াবর্তন সম্পর্ক, কালবর্তন সম্পর্ক, বিশেষণ সম্পর্ক, স্থানমাত্রিক সম্পর্ক, কার্যকারণ সম্পর্ক ইত্যাদি। যৌক্তিকতা ভাষ্যকে আভ্যন্তরীণ স্ববিরোধ থেকে মুক্ত করে।  আর ধারণার সাথে বস্তুর সংগতি সম্পর্ক থাকলেই কেবল  কোনো একটি বাচন বা ভাষ্য সত্য হয়ে ওঠে।

কিন্তু চেতনা ভাষার উৎস কারণ হলেও চেতনা, মানে মানুষ, প্রায়শঃ ভাষাবদ্ধ হয়ে যায়। মানুষ ভাষাকেন্দ্রিক চেতনায় আবদ্ধ হয়ে যায়। তার চেতনায় জীবন ও অস্তিত্ব বিষয়ক নতুন কোনো সত্য উপলব্ধি ঘটে না। পুরনো, প্রাক্তনের মধ্যেই সে আবর্তিত হতে থাকে, ঐতিহ্যের অনুবর্তন করতে থাকে। চেতনার এই ভাষাবদ্ধতায় চিন্তা, ভাষা, সংস্কৃতি তার প্রাকবর্তনী সীমার বাইরে বেরোতে পারে না। এই ভাষাবদ্ধতার বিপদ ঘটে তখনই যখন মানুষ বস্তুগত বীক্ষণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তার নিজের সত্তামূখী ও সমাজমূখী দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে আত্মকেন্দ্রিক জীবনে আবর্তিত হতে থাকে। এই আত্মকেন্দ্রিক আবর্তনে মানুষের চেতনায় তার গঠিত, আহৃত ধারণাগুলির সাথে বস্তুর কোনো সঙ্গতি সম্পর্ক থাকে না। তা হয়ে যায়  আজগুবি, কাল্পনিক। বস্তুর সাথে সঙ্গতি সম্পর্কহীনভাবে মানুষ তখন শুধুই ভাষার ব্যাকরণগত ও ভাষ্যের যৌক্তিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে ধারণার সাথে ধারণার বস্তু সম্পর্কহীন জোড়তালিতে দিতে থাকে, নতুন কোনো সত্যের উপলব্ধির যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। ভাষার নতুন বিকাশ, নতুন ভাষা সৃষ্টির সম্ভাবনা থেমে যায় পুরনো রীতি, শৈলী, রূপের অনুবর্তনে। চেতনার ভাষাবদ্ধতায় চিন্তা তখন ভাষা তথা সংস্কৃতির বিদ্যমান ধারণাবর্তনীর মধ্যেই আবর্তিত হতে থাকে। নতুন, অভিনব কোনো ধারণার জন্ম দিতে পারে না। চেতনা ও চেতনাগত চিন্তা ভাষারই পদাংকে ভূতপূর্ব মৃত ধারণারাশির অনুবর্তন করতে থাকে। যদিও ভাষা প্রকৃত পক্ষে চেতনারই বিকাশ ও গতিপথে সৃষ্ট চেতনারই পদাংক। চেতনার বিকাশ ভাষাসূত্রে নয়, চেতনার বিকাশ ঘটে ব্যক্তির সত্তা কর্ষণ ও সমাজমূখী সক্রিয়তা ও চিন্তার সূত্রে। তাই সত্তার কর্ষণহীনতায়, সত্তার দিকে অন্তর্মূখী ও সমাজের দিকে বহির্মূখী দৃষ্টিপাত না করে ভাষার পদাংক অনুসরণ করা মানে একই চিন্তা ও বিষয়ের পুনরাবৃত্তিতে নতুন কোনো ভাষিক, সাংস্কৃতিক, তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটাতে না পারা। যে ব্যর্থতায় ভাষা আর চেতনার বাহন থাকে না, চেতনাই হয়ে যায় ভাষার বাহন। ভাষার কেটে দেওয়া দাগ বা গণ্ডীর মধ্যেই চেতনা ঘুরপাক খেতে থাকে। চিন্তাতে ঘটে না নতুন কোনো বস্তুগত সংজ্ঞার উদ্ভাষণ। চিন্তা তখন অপ্রতিপাদ্য আবর্তনী অভিধার প্রমাহীন শব্দখেলা বা Language Game।

ভাষা ও চেতনার সম্পর্ক পারস্পারিক প্রভাব ও আন্তর্নিধারণের সম্পর্ক। ভাষা চেতনার বিকাশ ও প্রকাশের অন্যতম প্রকরণ। তা চেতনার সমৃদ্ধির অন্যতম শর্ত। সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিকাশের সংরক্ষণ ও সঞ্চালনের অন্যতম মাধ্যম ভাষা। পূর্ব প্রজন্মগত ঐতিহাসিক চেতনা বিকাশের ফলাফল ভাষার মাধ্যমেই সঞ্চালিত হয় পরবর্তী প্রজন্মে। তা পরবর্তী প্রজন্মের চেতনাকে পুষ্ট ও সমৃদ্ধ করে। পূর্ব প্রজন্মের সাথে পরবর্তী প্রজন্মের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। কিন্তু ভাষা হল চেতনার বিকাশের সহায়ক প্রকরণ, উপকরণ বা মাধ্যম। তা ঐ বিকাশের চালিকা শক্তি নয়। চেতনার বিকাশের প্রধান চালিকা শক্তি হল চেতনারই বস্তুমুখী অর্থাৎ সত্তা ও সমাজমুখী দৃষ্টি, বস্তুগত সম্পর্ক, সম্পর্কগত সংবেদন, সংবেদনগত চিন্তা ও চিন্তাগত অভিযোজন। কিন্তু চেতনার বস্ত সম্পর্কহীনতায়, সত্তা ও সমাজগত সংবেদন ও দৃষ্টিহীনতায় ভাষা চেতনার বিকাশে প্রকরণী ভূমিকা নয়, প্রধান, নির্ধারক, নিয়ন্ত্রক চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়। ভাষায় ধৃত, মূর্ত সংজ্ঞা, অভিধাই চেতনার বিষয়বস্তু, গতি, প্রবাহ, পরিধিকে নির্ধারণ করে। ফলে ভাষার মধ্যেই চেতনা সীমিত, সীমাবদ্ধ, সংকুচিত হয়ে যায়। চেতনায় কোনো নিস্ক্রান্তিক নতুন সংজ্ঞা, অভিধার উদ্ভাষণ নয়, পুর্ব প্রজন্মগত, ঐতিহ্যিক সংস্কৃতির ধারাবাহিত পুরনো সংজ্ঞা ও অভিধার মধ্যেই মানুষ আবর্তিত হতে থাকে। নতুন কালের অভূতপুর্ব প্রয়োজনের তাগিদে সাড়া না দিয়ে সে ঐতিহ্য, ঐতিহ্যিক সংজ্ঞা, অভিধা ও চিন্তারই প্রশ্নহীন অনুবর্তন করে। ঐতিহ্যের অনুবর্তন শৃংখল ভেঙে মানুষ বেরিয়ে আসতে পারে তখনই যখন সে চেতনার ভাষাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে, ভাষা ও ভাষাধৃত শাস্ত্র জ্ঞানকে সহায়ক উপকরণ রূপে ব্যবহার করে নিজের চেতনার বস্তুগত সম্পর্ক, সংবেদন, চিন্তা ও অভিযোজনকেই চেতনা বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি করে তুলতে পারে। আর যদি তা না পারে তাহলে ভাষা, ভাষামূর্ত শাস্ত্র, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যই ব্যক্তিকে নির্ধারণ ও নির্মাণ করে।

ভাষা হল একটি চিহ্নতন্ত্র। যে চিহ্নতন্ত্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে  চিহ্নক শৃংখলা, চিহ্নক ও চিহ্নিতের শৃংখলা, এবং  চিহ্নিতের শৃংখলার উপর। চিহ্নক হল ধ্বনি থেকে শব্দ থেকে শব্দ বিন্যাস। সুতরাং চিহ্নক শৃংখলা মানে ধ্বনি উচ্চারণের শৃংখলা, শব্দ গঠনের শৃংখলা ও শব্দ বিন্যাসের শৃংখলা। চিহ্নক ও চিহ্নিতের শৃংখলা মানে অর্থায়ন শৃংখলা। চিহ্নিতের শৃংখলা মানে ভাব বা ধারণার শৃংখলা। ধ্বনি শৃংখলা হল দৈহিক অভিযোজন। শব্দ গঠন, শব্দ বিন্যাস ও অর্থায়ন শৃংখলা হল ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক অভিযোজন। আর ভাব শৃংখলা বস্তু চেতনার ঐতিহাসিক বিকাশগত অভিযোজন। বস্তু চেতনা মানে চেতনার বস্তু সংযোগ, বস্তু বিষয়ক সংবেদন, চিন্তা ও সংজ্ঞা। কোনো এক যুগের মনীষায় অর্জিত ভাবগত শৃংখলাই চেতনার সত্তা কর্ষণী, বস্তুমুখী নিস্ক্রিয়তায় পরবর্তী যুগে চিন্তার শৃংখল হয়ে দাঁড়ায়, চিন্তার উত্তরাপেক্ষিক বিকাশের সামনে দেয়াল তুলে দেয়। কারণ ঐ ভাব শৃংখলার যুক্তি কাঠামোয় কোনো রক্ষণকামী, বস্তু সঙ্গতিহীন, অবাস্তব, অপ্রমাত্মক ধারণার সংক্রমণ বা অনুপ্রবেশ ঘটলে ঐ অবস্তুনিষ্ঠ যুক্তিতে চেতনায় জীবন সত্য ও সৌন্দর্যের সংজ্ঞায়ন হয় না এবং ঐ অবাস্তব যুক্তি ও যুক্তিজাত মিথ্যা আত্মগত সিদ্ধান্তগুলিই চিন্তার বিকাশের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এই দেয়াল বা ভাব শৃংখলার রক্ষণকামী আত্মগত যুক্তি শৃংখল থেকে চেতনার মুক্তি ঘটে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায়। দ্বান্দ্বিকতা মানেই স্বাধীনতা আর সেই স্বাধীনতায় উত্তরকে প্রশ্ন, বিশ্বাসকে সন্দেহ, সিদ্ধান্তে সংশয়, যুক্তির প্রতিযুক্তি, বাদ-প্রতিবাদ, বিরোধ-প্রতিরোধই দ্বান্দ্বিকতা। দ্বান্দ্বিকতা মানেই চিন্তা ও কর্মে বিপরীতের উত্থান, বিচার/সংগ্রাম ও বিরোধ থেকে আপেক্ষিক নিস্ক্রান্তির নিরন্তর প্রক্রিয়া। সত্তায় ও সমাজে। সত্তায় দ্বান্দ্বিকতা অর্থাৎ সত্তা কর্ষণ,- নিজেরই বিশ্বাস, সিদ্ধান্ত, কর্ম, কর্ম পদ্ধতিতে সন্দেহ, সংশয়, যুক্তির প্রতিযুক্তি, আত্মসমালোচনা ও স্ববিরোধ থেকে নিস্ক্রান্তি বা উত্তরণ। সমাজে দ্বান্দ্বিকতা মানে সামাজিক সমস্যার বিপরীত মেরুতে অবস্থিত পরস্পর বিরোধী শক্তির সংগ্রাম ও সেই সংগ্রামে সামাজিক জীবন পদ্ধতির আপেক্ষিক বিকাশে সমস্যা থেকে নিস্ক্রান্তি। চিন্তায় দ্বান্দ্বিক না হলে অর্থাৎ বিষয়ের বিপরীতমুখীন দিকগুলির বিচার, বিশ্লেষণ না করলে চিন্তা হবে একদেশদর্শী, স্থুল, অগভীর। দ্বান্দ্বিক না হতে পারলে চিন্তার রক্ষণকামী আত্মগত যুক্তি শৃংখল ভেঙে বেরিয়ে আসা যাবে না। ঐতিহ্যিক আপ্তবর্তনে চিন্তার অনুবর্তনই হবে চেতনার ভবিতব্য। আর দ্বান্দ্বিক হতে পারলে অর্থাৎ সত্তার গভীরে ডুব দিয়ে সত্তা কর্ষণে ও সত্তার বাহির বা সামাজিক সম্পর্কের অঙ্গনে নিস্ক্রান্তিক কর্ম ভূমিকা নিতে পারলে সেই কর্ষণ ও কর্মগত সংবেদনা, অভিজ্ঞানে স্নাত হতে পারলেই চিন্তা ভাষাবদ্ধতার শৃংখল ভেঙে বেরিয়ে এসে নব বিকিরণ ঘটাতে পারে। চিন্তার প্রকাশগত প্রয়োজনে তখন নতুন ভাষা নির্মিত হয়। সাহিত্য শিল্প বিজ্ঞান দর্শনে নবোদ্ভাসের প্রহর আসে।

দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি তাঁর চেতনা, চিন্তা, সংবেদন, অনুভুতি, ইচ্ছা, ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়ার বন্দী বর্তনী ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারে। এই বন্দীবর্তন ভেঙে বেরিয়ে আসতে না পারলে চেতনা ও চিন্তার ভাষাবদ্ধতা, ভাষাবর্তন থেকে মুক্তিতে বস্তুর বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ সংবেদন, পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, ও স্বজ্ঞায় উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। আর তা না করা গেলে ভাষার সূত্রে চেতনা ও চিন্তা ঐতিহ্যগত, পরম্পরাধৃত মূল্যবোধ ও ধারণা বর্তনীতেই ঘুরপাক খায়।

মানুষ বাস করে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্কের কাঠামোয়। এই কাঠামোয় বিভিন্ন ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানগত পার্থক্য আছে। ব্যক্তির চেতনা, চিন্তা, সংবেদন, অনুভুতি, আবেগ, ইচ্ছা, ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া তাঁর সামাজিক অবস্থান দ্বারা বিশেষিত, নির্ধারিত (structured)। সামাজিক সম্পর্ক ব্যক্তিসত্তার সামাজিক বিশেষক (social modifier)। যে সামাজিক সম্পর্কগুলির মধ্যে তাঁর নিশ্বাস প্রশ্বাস, তাঁর জীবনের প্রয়োজন সূত্রে যে সামাজিক সম্পর্কসমূহ তিনি তৈরি করছেন, বা তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছেন, প্রাথমিকভাবে সেগুলিই তাঁর চেতনা, চিন্তা, সংবেদন, অনুভুতি, আবেগ, ইচ্ছা, ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়াকে বিশেষিত করে, যতক্ষণ ব্যক্তি অবচেতন, অচেতন, প্রবৃত্তিক অনুবর্তনে বন্দী, যতক্ষণ না তিনি দ্বান্দ্বিকভাবে সচেতন ও সক্রিয়। ঐ সামাজিক সম্পর্কসমূহই তাঁর চেতনা, চিন্তা, সংবেদন, অনুভুতি, ইচ্ছা, আবেগ, ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়ার একটি বিশেষ বর্তনী (fixed response circuit or modality) গড়ে তোলে। বর্তনী অর্থাৎ উদ্দীপক থেকে চিন্তা/ইচ্ছা/ক্রিয়া/প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট, প্রায় যান্ত্রিক উদ্দীপনাগত পুনরাবর্তনশীল, পুনরাবর্তনীয়, পুনরাবর্তমান প্রক্রিয়া বা পথ বা কাঠামো। বর্তনী গড়ে ওঠা মানেই চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ, ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার একটি বিশেষ ধাঁচ বা শৃঙ্খলে আঁটকে যাওয়া। যেমন কোনো হিন্দুর মুসলিম বিদ্বেষ, বা কোনো মুসলিমের হিন্দু বিদ্বেষ। তাদের চেতনায় চিন্তা, আবেগ, মানসিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার এক প্রায় যান্ত্রিক উদ্দীপনগত প্রতিবর্ত শৃঙ্খল গড়ে ওঠে। আর তাই এই বিদ্বেষের বর্তনী বা শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। এই বিদ্বেষ এক ধরনের সাইকোসিস, যা গড়ে ওঠে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে, সামাজিক, ঐতিহাসিক স্মৃতি থেকে, পারিবারিক পরম্পরা বাহিত মানসিক প্রভাব থেকে, এমনকি রাষ্ট্রীয় শিক্ষাঙ্গন থেকেও। চিন্তা, আবেগ, ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার এই বদ্ধ বর্তনী ভেঙে চেতনার মুক্তির প্রক্রিয়া দ্বান্দ্বিক হওয়া। নিজের বিরুদ্ধে নিজেই দাঁড়ানো। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ। নিজের চিন্তা, ইচ্ছা, ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার স্ববিরোধিতা থেকে মুক্তির সংগ্রাম। এই দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াতেই ঘটে ব্যক্তিসত্তার বদ্ধবর্তনী থেকে মুক্তি ও সমাজের কাঠামোগত মুক্তি। সৃষ্টি হয় সমাজের অন্তর্গঠন বা কাঠামোর বিকাশ, রূপান্তর ও বিবর্তনমূলক(trans-structural) ইতিহাস।

সাহিত্য, শিল্প হল ব্যক্তি সত্তার এই বদ্ধ বর্তনী ভাঙার প্রযুক্তি। কবি রবির ভাষায়, ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে? সাহিত্য তথা শিল্পের সৃজনী উৎস হল ব্যক্তির সত্তায় ও সামাজিক জীবনে, অর্থাৎ তার ঘরে, সত্য, মঙ্গল ও সুন্দরের অভাববোধ ও তার অভীপ্সা। ঘরের বন্দীত্ব থেকে বেরিয়ে আসার আকাঙ্খা, সত্তার সীমা থেকে মুক্তির আকাঙ্খা। সত্যের অভীপ্সায় জ্ঞানের অন্বেষণ, মঙ্গলের অভীপ্সায় নৈতিক অন্বেষণ, আর সুন্দরের অভীপ্সায় নান্দনিক সৃজনশীলতা। সত্য, মঙ্গল আর সুন্দরের অভীপ্সায় জীবনে ও সমাজে সাহিত্যের প্রভাব ও ফলাফল হল চেতনা, চিন্তা, সংবেদন, অনুভুতি, ইচ্ছা, ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়ার সমাজ ও আত্মবিশেষিত বর্তনী থেকে মুক্তির লক্ষ্যে, আত্মনির্ধারণ ও স্ববর্তন বা স্বাধীনতার লক্ষ্যে ব্যক্তির চেতনায় দ্বান্দ্বিক স্ফুলিংগ প্রজ্বলন। সাহিত্য, শিল্পের কাজ হল চেতনার বর্তনী থেকে মুক্তিতে বস্তুর সত্য, মঙ্গল ও নন্দনগত বাস্তবতা বিষয়ে ব্যক্তিকে অন্তর্দীপ্ত করে তোলা। তার জন্য তাকে নিজেরই মুখোমুখী, নিজের জীবনের আপেক্ষিক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। তার জীবনের সত্য, মঙ্গল ও সৌন্দর্যগত মূল্যায়ন করা। তার সচেতন সক্রিয় ভূমিকায় তার বর্তমান জীবনের দ্বন্দ্বগুলির মীমাংসাগত নান্দনিক উত্তরাপেক্ষিক জীবন-বাস্তবতার আভাষ দেওয়া।

ব্যক্তি সত্তার বদ্ধ বর্তনী, সীমা, বেস্টনী ভেঙে তার চেতনা, চিন্তা, সংবেদনাকে অর্গলমুক্ত করাটাই সাহিত্য, শিল্পের কাজ। তার চেতনার অর্গল ভেঙে তার জীবনের আপেক্ষিক বাস্তবতা ও সামাজিক বাস্তবতার সামনে দাড় করিয়ে দিয়ে তাকে দেখিয়ে দেওয়া তার জীবনের দগদগে ঘা, ক্ষত, বিকার, দুর্দশা, ব্যর্থতা, পরাধীনতা, অতৃপ্তি, অভাব, অবদমন, আত্মপ্রতারণা। তাকে দ্বান্দ্বিক করে তোলা। দ্বান্দ্বিক অর্থাৎ তার জীবনের আত্মসত্তাগত ও সামাজিক সম্পর্কগত দ্বন্দ্বগুলির মীমাংসার শক্তিময় হয়ে ওঠার তাগিদ সৃষ্টি করা। তার চেতনায় দ্বান্দ্বিক ক্রিয়াভিমুখ সৃষ্টিতে দ্বন্দ্বদীর্ণ সামাজিক ও সত্তাগত অবস্থাটিকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রেরণা দেওয়া। এবং দ্বন্দ্ব থেকে নিস্ক্রান্তিগত জীবনের, সমাজের ক্ষতমুক্ত, স্বাধীন, সুন্দর উত্তরাপেক্ষিক বাস্তবতারও চিত্রায়ন করা।

কিন্তু এই কাজে সাহিত্য, শিল্প তখনই সফল হবে যখন পাঠকের চেতনায়, উপভোক্তার চেতনায় শিল্পী-সংবেদক তাঁর নিজস্ব মতাদর্শ, চিন্তা বা দৃষ্টিকোণের আরোপণ ঘটাবেন না। এই ধরনের আরোপণ ঘটালেই পাঠক তার সত্তাবর্তনী থেকে না বেরিয়ে, শামুকের মতই, তারই মধ্যে আত্মগোপন করে, তার চিন্তা ও চেতনার রক্ষণাত্মক অবস্থানেই জগদ্দল পাষাণের মত অনড়, অচল থেকে যায়। সাহিত্য, শিল্প চেতনার বদ্ধ বর্তনী ভাঙতে সফল হয় তখনই, যখন তা  উপভোক্তা-সংবেদকের চেতনায় আত্মসম্মোহনের উদবোধন করতে পারে। আত্মসম্মোহনের মধ্য দিয়ে উপভোক্তার আত্মচেতনা সংবেদক ও সংবেদ্য রূপে দ্বৈতায়িত হয়। আত্মসম্মোহনমূলক দ্বৈতায়নে ভেঙে পড়ে চেতনার রক্ষণ বর্তনী,  অবারিত হয়, একই সাথে, আনন্দ ও বস্তু সম্পর্কিত সংজ্ঞায়নের মুক্ত ধারা। যা ব্যক্তির চেতনায় ভাবগত দ্বান্দ্বিকতার উদবোধন ঘটায়। আত্মসম্মোহনের পদ্ধতি হল উপভোক্তার চেতনায় সংবেদনের উদ্দীপন। সংবেদনের উদ্দীপনের ভিত্তি হল মানব সত্তার অদ্বৈত সাধারণ বাস্তবতা। আর সাহিত্যের ক্ষেত্রে সংবেদন উদ্দীপনের প্রযুক্তি হল ভাষার নিপুণ, সুদর্শী ব্যবহারে সংবেদনের বৈষয়িক প্রতিষঙ্গের উপস্থাপনী কলাশৈলী।

সুতরাং আনন্দের মধ্য দিয়ে, আনন্দ সৃষ্টির আত্মসম্মোহনমূলক পদ্ধতিতেই, সত্তার নান্দনিক ব্যাকরণ মেনেই, আত্মবন্দী সত্তার বদ্ধ বর্তনী ভাঙা সম্ভব, তার ঘরের চাবি ভাঙা সম্ভব। সংবেদন উদ্দীপ্ত সংজ্ঞায়নে তাকে দ্বান্দ্বিক করে তোলা সম্ভব। আর দ্বান্দ্বিক হয়ে ঊঠলেই মানুষের আত্মসত্তাগত ও সমাজগত পরিবর্তনও সম্ভব। সাহিত্যের কাজ বাহির থেকে কোনো দল বা সংঘ আরোপিত নির্দেশাবলী পালন নয়। সাহিত্যের উদ্দেশ্য, বিষয়, পদ্ধতি, প্রভাব বা কার্যকারিতা সবই মানব সত্তার বাস্তবতা, প্রকৃতি ও তার নান্দনিক ব্যাকরণের স্বাভাবিক ফলশ্রুতি। জগতের সমস্ত মহান শিল্প কর্ম মানব সত্তার এই নান্দনিক ব্যাকরণ নির্দেশিত স্বাভাবিক পথেই হেঁটেছে।       

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Moments

Dialectical process of development of human society has clearly three levels. Unity of opposites, struggle of opposites and the negation of negation. The rise from the level of unity of opposites in social relations to the struggle of opposites to the negation of negation is no linear and automatic and mechanistic progression. There may not be any struggle of opposites in the state of unity of opposites in social relations for a period. It may be recessive and passive, a surrender, submission, conformity, compliance, capitulation to the dominant force of the contradiction. It may be a petrified, fossilized, static contradiction resulting in no positive development of the society producing sufferings and misery for the people and relegating them to the level of a subconscious being in a total ideological reconciliation with the dominant side. The transition from the state of unity to the state of struggle demands a conscious recognition of the contradiction, which is stimulated by the contradiction itself. But this consciousness may be prevented by a mystification of the contradiction veiled in forms of illusion and fiction, which is done by the ideological hegemony of the ruling class. The static contradiction can’t turn to a dynamic or dialectic contradiction rising to the level of the struggle of opposites. The dialectical movement of a contradiction through the struggle of opposite forces in the contradiction towards a negation or transcendence of the cause of contradiction is the active and creative period of history. In the level of negation of negation the contradiction is resolved and eliminated and the society rises to the next higher stage. But the negation of negation is not guaranteed. It is relative to the strength of the liberating side of the contradiction in its struggle against the regressive side. The mode of negation is also important. It must be dialectical, not imposed or forced negation or formal negation. If it is forced or imposed or formal, it will not be a negation of negation, but a continuation of repression or domination in a new form. Society will slide down again to the state of the unity of opposites. Dialectic, therefore, doesn’t indicate a linear historical progress of human society. There are delays and downslides.

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Moments

In every forms of social relations from economic to political to instinctual-emotional to ideological-customary to ideological-organizational, power is a mode of relation in action or action in relation, which is oriented towards control and domination of others. From micro spheres of everyday life to macro spheres of economy and politics everywhere power is present in various forms, but they are essentially the same, a precedence of the self, prioritization of the self, a centering of the self, privileging of the self over others. And that’s why, I think, Foucault’s concept of technique of the self, practices of the self, relationship with the self is most relevant to combat power in its every form.

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Moments

Arendt fails to understand that the realm of economic necessity and relations can not be bypassed or evaded or avoided or wished away by men, but only can be controlled, regulated, organized and planned by political actions, because economic activity is the first priority of life for being the very basis of reproduction of our physiological existence. Political activity must be centred around the reorganization of the world of economic production to secure every person’s interests and wellbeing. That is the essence of a good deed. Politics is all about economic transformation of life. Only then political freedom can be realized. Without freedom from and control over economic forces of necessity there can be no freedom of political actions. She rightly sees and criticizes totalitarianism of government to protect the individuals from an authoritarian state, but doesn’t see and denounce the totalitarianism and ravages and violence of the capitalist market relations in human life. She rightly stresses on the distinction of the private and the public to ensure individual liberty, but doesn’t recognize and condemn the forces of economic privatization of the means of social production and the consequent violation of individual liberty by transgression of the boundary or limit of the private by capital. She locates the boundary between the private and the public in governance, but not in the economic domain. And that’s her contradiction or compromise.

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Moments

Democracy is a mode of governmentality. It should not be equated or conflated with capitalism. Socialism is a mode of economic organization of production and distribution and investment. There is no contradiction between them. Rather a society with antagonistic classes and interests i.e. a capitalist society can never be democratic. Such society is a society of class domination. With economic inequality embedded in it, such society is bound to be essentially anti-democratic, only posing as formally democratic, because economic and political dominance of the capitalist class is a deterrence to democracy. Democracy can be realized as a form of governance only in a society where there is no political class dominance founded on the ownership and control of the means of social production. Democracy in such society is a necessary form of interaction between and resolution of non-antagonistic conflicts and differences of views regarding administration of social affairs, a mode of social being to ensure participation and responsibility of people in deciding upon and controlling the courses of their life. Democracy is a form of self-rule. Without which there can be no socialism.

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Moments

Farmers, teachers are functional classes resulting from the difference in their area of functions. But these functional classes based on division of labour are not economic exploitative classes. In a hierarchical relations of production they have unequal right to value. This inequality is structural. A social economy of distribution based only on the labour function can change it. Such a society can equalize everyone’s share of social value with his needs in a higher stage of productivity. Capitalism hierarchizes workers according to their functional roles and importance in the structure of its profit generation system. Managers are more important to capital and higher paid, not because they contribute more than the ordinary workers, but because they manage the workers, the real generators of profit. Managers are higher paid, only because the workers are exploited and lower paid. Unequalization of shares of various forms of labour is the soul and source of capital’s growth and a technique of management by divisions among the worker.

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Moments

In the twenties Stalin was supporter of the NEP. Trotsky was against it. Trotsky favoured rapid industrialization by the socialist state, even by socialist primitive accumulation from the agricultural sector by differential pricing. Trotsky was ridiculous in his naivety. Stalin later finished Trotsky but adopted Trotsky’s naïve view of socialist primitive accumulation by differential pricing for a rapid industrialization in a decade what, in his own words, Britain did in a century. He dropped the gradualist programme of socialist evolution of society adopted by Lenin to opt for a rapid forced development. I think that is the root of all evil let loose upon the USSR by Stalin. Stalin was not a subtle theoretician like Lenin. I would dare say he was a clever politician and nothing more. He finished Trotsky, but enacted his programme. That shows the bankruptcy of his own ideas, his hollowness as a Marxist theoretician.

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Moments

There was no space and scope of dialectical free play of ideas inside and outside the communist party in the thirties in the USSR. There was only polemics and partisan opposition and repression of ideas. The reactions of the forced collectivization might have been cathartically released and neutralized in the society by the freedom of dialectical interactions between ideas. Instead there were only power struggles, factional strifes and repression inside the party. There were no democratic space. After 1935 there were even very few politburo meetings. Decisions would be taken by Stalin in consultation with two or three other members who always confirmed and supported his opinion. Therefore, I think, socialist political leadership must be collective and horizontal, not singular and hierarchical. Singular and hierarchical leadership is monarchical in character and an anomaly in socialist structure. I think USSR could have averted the Stalinist tragedy, if there were not hierarchical singular leadership. Not a secretary, but a Secretariat. Not a president, but a presidium.

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Moments

A different perception of the one-party state emerged after 1928 and was expressed by Stalin in 1936 when he introduced the revised Soviet Constitution which made provision for only one political party, namely the Communist Party. The question then was whether a multi-party system could operate in Russia. Stalin answered it when he said: “A party is a part of a class, its most advanced part. Several parties, and consequently freedom for parties, can exist only in a society in which there are antagonistic classes whose interests are mutually hostile and irreconcilable – in which there are, say, capitalists and workers, landlords and peasants, kulaks and poor peasants, etc. But in the USSR there are no longer such classes as the capitalists, the landlords, the kulaks etc. In the USSR there are only two classes, workers and peasants, whose interests – far from being mutually hostile – are on the contrary friendly. Hence there is no ground in the USSR for the existence of several parties, and consequently for freedom for these parties….In the USSR only one party can exist – the Communist Party….” But a multiparty system of socialism could have saved the USSR. There may not be any class basis of a multiparty system, but there were differences of views about the strategy of implementation and building of a socialist society. The multiparty system of election to the supreme soviet would have been an effective vehicle of dialectical expression and competition between those views. I am sure the USSR would survive.

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Moments

Social contradictions arise from the class interests in opposition in a class divided society. These contradictions are expressed in the existence and voices of different parties in a class society. In a socialist society there may not be such contradictions, but a different form of contradiction is there, the contradiction between those seated in positions of power and those who are not. Power is a mode of relation in action, or action in relation to control and dominate, discipline and punish. Power, therefore, inevitably, gives rise to selfish interests, privileges, domination and subordination. This form of contradictions between the powerful and the non-powerful can be resolved in a socialist society only through the freedom of political activity in a multi-party political system which can counteract against the possibility of the rise of power relations by providing a scope and freedom of dialectical free play of ideas and actions inside the system.

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান